সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন দরপত্র, বদলেছে কিছু শর্ত

সংগৃহীত ছবি
বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে সরকার। আগের চেয়ে বেশ কিছু শর্ত পরিবর্তন করা হয়েছে, যাতে বিদেশি কোম্পানি আকৃষ্ট হবে বলে আশা করছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
আজ দুপুরে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলছিলেন, অনেকদিনের জট খুলে নতুন অধ্যায়ের সুচনা হতে যাচ্ছে। মাটির নিচে নিজেদের জ্বালানি ফেলে রেখে বিগত সময়ে আমদানিতে ঝোঁক ছিল। আমদানি নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে। সেই অবস্থা মুক্তির জন্যই এই উদ্যোগ।
অতীতের ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো সংশোধন করে বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখেই অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে বলে জানালেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দা ইসলাম অমিত। তিনি বললেন, ১৮০ দিনের বর্তমান সরকারের যে পরিকল্পনা তারই অংশ হিসেবে এই দরপত্র আহ্বান করা হলো।
২০১২ সালে ভারতের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধের ঐতিহাসিক নিষ্পত্তি হয়। এরপরই প্রতিবেশী দুই দেশ তাদের অংশে অনুসন্ধান চালিয়ে তেল-গ্যাস উত্তোলন শুরু করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনও অনুসন্ধানই শুরু করতে পারেনি। সেই প্রসঙ্গ তুলে বিদ্যুৎ মন্ত্রী বলছিলেন, সমুদ্র বিজয় নিয়ে অনেক লাফালাফি করা হলেও সেখানকার সম্পদ যে উত্তোলন করতে হবে তারা তা ভুলে গিয়েছিল।
জ্বালানিকে ভিত্তি করেই দেশের উন্নয়ন হয়। অতীতে অনেক বড় বড় কথা বলা হয়েছে। কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মুখে পড়ে। আস্তে আস্তে সেই পরিস্থিতির অনেকটাই উত্তোরণ হয়েছে। আমরা এখন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই, যোগ করেন তিনি।
সরকারের কিছুটা অবহেলা আর নানা কারণে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অনাগ্রহের কারণেই এমন পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। তবে এবার উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি বা পিএসসিতে আগের চেয়ে বেশ কিছু শর্ত শিথিল করা হয়েছে। তাতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহী হবে বলে আশা কর্মকর্তাদের।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, অতীতের নানা ভুলত্রুটি ও বিদেশি কোম্পানিগুলোর অনীহার কারণ বিবেচনা করে এবারের দরপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। মূলত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং একটি প্রতিযোগিতামূলক বিডিং প্রক্রিয়া গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য একগুচ্ছ আকর্ষণীয় সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। এবারের নীতিমালার মূল লক্ষ্যই হলো-সরকার ও বিনিয়োগকারী উভয় পক্ষের স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রেখে যোগ্য, দক্ষ ও অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের গতি বাড়াতে এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ২০২৬’-এ বেশ কিছু যুগান্তকারী সংশোধন আনা হয়েছে। অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ইতোমধ্যে এই নতুন মডেলের খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, নির্বাচিত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ‘এমপিএসসি ২০২৬’ কাঠামোর আওতায় চুক্তি সই করা হবে।
দরপত্র আহ্বানের পাশাপাশি ব্যাপক প্রচারের জন্য আন্তর্জাতিক 'রোড শো' এবং বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বিদেশি দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে চিঠি পাঠিয়ে প্রচারণা চালানোর জোরালো উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
অফশোর প্রকল্পগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে ও বাণিজ্যিক দিক থেকে লাভজনক করতে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে যেখানে গ্যাসের দাম উচ্চ সালফার ফুয়েল অয়েলের মূল্যের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হতো, এখন থেকে তা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচলিত ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দামের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে।
নতুন ব্যবস্থার আওতায়, গভীর সমুদ্র ব্লকে উত্তোলিত গ্যাসের দাম নির্ধারিত হবে বিগত তিন মাসের গড় ব্রেন্ট মূল্যের ১১ শতাংশ হারে। অন্যদিকে, অগভীর সমুদ্র ব্লকের ক্ষেত্রে এই হার ধরা হয়েছে ১০.৫ শতাংশ, যা ২০২৩ সালের মূল্য কাঠামোয় ছিল মাত্র ১০ শতাংশ। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা থেকে সুরক্ষার জন্য গত পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গড় ব্রেন্ট মূল্যের ভিত্তিতে একটি ফ্লোর মূল্য (সর্বনিম্ন) এবং সিলিং মূল্য (সর্বোচ্চ) নির্ধারণ করা হবে। এই কাঠামো অনুযায়ী প্রতি ব্যারেলের সর্বনিম্ন মূল্য ৭০ ডলার এবং সর্বোচ্চ ১০০ ডলার ধরে গ্যাসের দাম হিসাব করা হবে এবং প্রতি ৫ বছর পর পর এই মূল্য কাঠামো পুনর্বিবেচনা বা সমন্বয় করা হবে।
এর বাইরেও আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর ঝুঁকি কমাতে ও লাভ বাড়াতে চুক্তিতে স্বার্থ হস্তান্তর ও শেয়ার ট্রান্সফারের নমনীয় সুযোগ রাখা হয়েছে। উৎপাদিত গ্যাসের ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলার ‘রাইট অব ফার্স্ট রিফিউজাল’ বা প্রথম ক্রয়ের অধিকার বজায় থাকবে; তবে পেট্রোবাংলা গ্যাস না কিনলে ঠিকাদার কোম্পানি তাদের অংশ দেশীয় বাজারে যেকোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করতে পারবে। এমনকি একই শর্ত মেনে উদ্বৃত্ত গ্যাস বিদেশে রপ্তানির সুযোগও রাখা হয়েছে।
বাধ্যতামূলক কাজের অংশ হিসেবে এবার শুধুমাত্র দ্বিমাত্রিক সিসমিক জরিপকে নির্দিষ্ট রাখা হয়েছে। যদিও দরদাতাদের অতিরিক্ত কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। তবে কোনো দরদাতা কোম্পানি যদি পেট্রোবাংলার কাছে থাকা বিদ্যমান দ্বিমাত্রিক মাল্টিক্লায়েন্ট সিসমিক ডাটা কিনে নেয়, তবে তাদের জন্য বাধ্যতামূলক কাজের পরিমাণ আনুপাতিক হারে কমিয়ে দেওয়া হবে। প্রথম অনুসন্ধান কূপ খননের পর সেটি যদি শুকনো বা বাণিজ্যিকভাবে অকার্যকর প্রমাণিত হয়, তবে ঠিকাদার কোম্পানিকে উৎসাহিত করতে দ্বিতীয় বা পরবর্তী কূপগুলোর ক্ষেত্রে বেশি মুনাফা ভাগের আকর্ষণীয় প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর ন্যূনতম অনুসন্ধান কর্মসূচি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা হিসেবে নির্ধারিত ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দিতে হবে। এ ছাড়া দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে অগভীর সমুদ্র ব্লকের ক্ষেত্রে তাদের ১০ শতাংশ ‘ক্যারিড ইন্টারেস্ট’ বা বিনা পুঁজিতে অংশীদারিত্ব দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। অবশ্য সরকার বিশেষ প্রয়োজনে যেকোনো সফল দরদাতাকে সীমিত সংখ্যক ব্লক বরাদ্দ দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা নিজের কাছে সংরক্ষণ করবে।
অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা
সাগরে মোট ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে এই দরপত্র আহ্বান করা হবে। এর মধ্যে ‘এসএস-০১’ থেকে ‘এসএস-১১’ পর্যন্ত মোট ১১টি ব্লক অগভীর সমুদ্রে অবস্থিত। অন্যদিকে ‘ডিএস-০৮’ থেকে ‘ডিএস-২২’ পর্যন্ত বাকি ১৫টি ব্লক রয়েছে গভীর সমুদ্রে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এককভাবে কিংবা যৌথ উদ্যোগ গঠনের মাধ্যমে এক বা একাধিক ব্লকের জন্য আবেদন করার সুযোগ পাবে। এবারের টেন্ডারে অংশগ্রহণকারীদের আর্থিক সাশ্রয়ের কথা বিবেচনা করে একটিমাত্র টেন্ডার শিডিউল বা দরপত্র দলিল ক্রয় করেই একাধিক ব্লকে অংশ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে সে ক্ষেত্রে প্রতিটি আলাদা গভীর ও অগভীর সমুদ্র ব্লকের জন্য পৃথক পৃথক প্রস্তাব বা আবেদন জমা দিতে হবে। তবে ভৌগোলিকভাবে পরস্পর সংলগ্ন দুটি গভীর সমুদ্র ব্লকের ক্ষেত্রে একটি একক চুক্তির আওতায় যৌথ আবেদন করার বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে।







