টেক্সটাইল খাতে মুনাফা সংকট, বাড়ছে লোকসানি কোম্পানি

ফাইল ছবি
সুতা ও ফেব্রিকের দাম কমে যাওয়া, বৈশ্বিক বাজারে পোশাকের চাহিদা হ্রাস এবং উচ্চ পরিচালন ব্যয়ের কারণে ধুঁকছে দেশের তালিকাভুক্ত টেক্সটাইল কোম্পানিগুলো। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে মুনাফা কমেছে অধিকাংশ কোম্পানির। এমনকি নতুন করে লোকসানে পড়েছে কয়েকটি কোম্পানি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যচাপ, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদের ব্যয়ের সমন্বিত প্রভাবে বহুমুখী সংকটে পড়েছে টেক্সটাইল খাত। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শেয়ারবাজারেও। কারণ তালিকাভুক্ত ৫৮টি টেক্সটাইল কোম্পানির মধ্যে বর্তমানে ২৭টিই রয়েছে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে, যা খাতটির দুর্বল আর্থিক ভিত্তিরই প্রতিফলন।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। দীর্ঘ ঈদের ছুটি, জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং রপ্তানি চালান বিলম্বিত হওয়ায় অনেক কোম্পানির বিক্রি ও মুনাফা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে টেক্সটাইল পণ্যের দাম কমেছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট উৎপাদন ব্যাহত করছে। ফলে মার্জিন ধরে রাখতে পারছে না কোম্পানিগুলো। বিক্রয়মূল্য যেভাবে কমছে, কাঁচামালের খরচ সেভাবে কমছে না। এতে উৎপাদন স্থিতিশীল থাকলেও মুনাফা কমে যাচ্ছে কোম্পানিগুলোর।
খাতের বড় কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনেও সেই সংকটের প্রতিফলন দেখা গেছে। স্কয়ার টেক্সটাইলসের মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে রাজস্ব কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ। একই সময়ে কোম্পানিটির মুনাফা ৭০ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩০ কোটি ৪০ লাখ টাকায়। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে উচ্চ আর্থিক ব্যয় ও কম বিক্রির কারণে লোকসানে পড়েছে কোম্পানিটি।
ডিবিএল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান মতিন স্পিনিং জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তুলার মূল্যচাপের কারণে তাদের গড় বিক্রয়মূল্য প্রতি কেজিতে ৩ দশমিক ৬৫ ডলার থেকে কমে নেমেছে ৩ দশমিক ৪৭ ডলারে। ফলে বিক্রি সামান্য বাড়লেও ৯ মাসে মুনাফা কমেছে ৯ শতাংশ।
এনভয় টেক্সটাইলসের রাজস্ব কমেছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মুনাফা কমেছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। বিশেষ করে তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির মুনাফা ৩৭ শতাংশ এবং রাজস্ব কমে যায় ১৩ শতাংশ।
অন্যদিকে শাশা ডেনিমসের মুনাফা কমেছে ৭২ শতাংশ। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে প্রায় ৩ কোটি টাকা লোকসান করেছে কোম্পানিটি। কম কার্যদিবসের মধ্যেও বেতন, বোনাস, বিদ্যুৎ বিল ও অবচয়সহ স্থায়ী ব্যয় বহন করায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।
ফারইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে ২১ কোটি ৭০ লাখ টাকার নতুন লোকসান করেছে। কোম্পানিটির বিক্রি কমেছে ১৮ শতাংশ। একই সময়ে এসকোয়ার নিট কম্পোজিট ১২ কোটি ৯০ লাখ টাকার লোকসান দেখিয়েছে। যদিও বিক্রিতে সামান্য প্রবৃদ্ধি ছিল, তবে পরিচালন ব্যয় ১২ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় লোকসানে পড়েছে কোম্পানিটি।
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ সুদের ঋণ, ডলারের চাপ এবং কম রপ্তানি আদেশ এখন টেক্সটাইল খাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে স্পিনিং মিলগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে সুতা ও ফেব্রিকের দাম দ্রুত কমছে।
টেক্সটাইল খাতের এই সংকট মূলত তৈরি পোশাকশিল্পের ধীরগতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কিন্তু চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে নিটওয়্যার রপ্তানি ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ কমে নেমেছে ১৫ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে ওভেন পোশাক রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ, যা দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা দ্রুত ঘুরে না দাঁড়ালে এবং ব্যাংকঋণের সুদ ও জ্বালানি সংকট কমানো না গেলে আগামীতে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে টেক্সটাইল খাতের জন্য।





