প্রস্তাবিত বাজেট নিখুঁত হয়নি ঋণের বোঝায়

বিগত অন্তর্বর্তী ও আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া বিশাল ঋণের চাপ মোকাবিলায় প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে শতভাগ নিখুঁত করা সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বাজেটের নানা দিক এখনো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাজেট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ আছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে চলমান অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে আরও দুই বছর লাগবে। গতকাল রবিবার রাজধানীর গুলশানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট সংলাপ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী।
আমির খসরু বলেছেন, ‘বিগত ১০ বছর ধরেই আমি বলে আসছি যে, স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া উচিত নয়। সরকার ১০-১৩ শতাংশ সুদে ব্যাংক থেকে টাকা নিলে বেসরকারি খাতের জন্য টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়ে। সরকার এই উচ্চ সুদে টাকা নিয়ে কীভাবে তা পরিশোধ করবে, তখন সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তাই আমরা ধীরে ধীরে ব্যাংকনির্ভরতা কমিয়ে বাজারভিত্তিক ও বিকল্প অর্থায়নের দিকে নজর দিচ্ছি। দেশীয় ব্যাংক থেকে সরকার ধীরে ধীরে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসবে।’
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, প্রস্তাবিত বাজেটের প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে ঋণের সুদ বা ডেট সার্ভিসিংয়ে, ফলে সরকারের খরচের জায়গা বা ‘ফিসকাল স্পেস’ সংকুচিত হয়ে আসছে। আর বিগত সরকার নিজেদের স্বার্থে প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রকল্প নিয়েছিল। এর মধ্যে অনেক প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে।
তিনি বলেছেন, ‘এনবিআরের পলিসি বিভাগ আমলাদের দিয়ে চলবে না। সেখানে কর বিশেষজ্ঞরা দায়িত্ব পাবেন। আর অনেকে ট্যাক্স না দেওয়াটা ভালো কিছু ভাবেন। এ মানসিকতা থাকলে দেশ এগোবে না। অল্প হলেও দেশের মানুষকে করের আওতায় আসতে হবে। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘এ বছর মোট বাজেটের ২ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আমি বলব না এটি কম হয়েছে। ৫ শতাংশ আমাদের লক্ষ্য। আমরা ইশতেহারেও বলেছি, স্বাস্থ্য খাতে আমরা ৫ শতাংশে যাব। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ছাড়া আমরা কথা বলতে পারব; কিন্তু কিছু অর্জন হবে না।’
গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতিকে প্রধান সমস্যা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তিন মাসে তো এসব সমস্যা সমাধান করা যাবে না; টাকা দিয়েও হবে না। বিগত সরকার গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ না নিলেও বর্তমান সরকার শুরু করেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ঐতিহাসিক স্থবিরতা ও দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে আগামী জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে বিশেষ ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালু করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
সেমিনারে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেছেন, একটি ধ্বংসপ্রায় ও ভঙ্গুর অর্থনৈতিক কাঠামো উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকব্যবস্থা পুনর্গঠনে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। এ অবস্থায়, মানুষের প্রবল প্রত্যাশার মুখে কোনো রক্ষণশীল নীতি নয়, অর্থনীতিতে গতিসঞ্চার এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনাই সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, সাধারণ মানুষের কাছে ঋণ এখন বিনিয়োগের মাধ্যম নয়; বরং টিকে থাকা বা বেঁচে থাকার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো খাদ্য বা ভোগ কমিয়ে দিচ্ছে, চিকিৎসাসেবা নেওয়া পিছিয়ে দিচ্ছে, একসঙ্গে একাধিক কাজ করছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প টিকে থাকতে পারছে না। ব্যাংকের সুদের চড়া হার আরেক মাথাব্যথার কারণ।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, নতুন কর-কাঠামোয় তুলনামূলক কম আয়ের মানুষের ওপর করের বোঝা বেশি বাড়ছে। এই শ্রেণির করদাতাদের করদায় সাড়ে ১২ থেকে সাড়ে ১৬ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। কিন্তু ৩০ লাখ টাকার বেশি বার্ষিক আয় করা উচ্চবিত্তদের ক্ষেত্রে এই করের দায় বৃদ্ধির হার তুলনামূলক অনেক কম। এটি সামাজিক সমতা ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।




