রাকাবের ‘সস্তা ঋণ’ কঠিন প্রতারণা
- ৬ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়ে সাড়ে ১২ শতাংশ আদায়
- কিস্তি জমা না দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ
- রাকাবে যা ঘটেছে তা রীতিমতো জালিয়াতি ও ফৌজদারি অপরাধ: মুখপাত্র, বাংলাদেশ ব্যাংক
- একজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, অন্যদের বিষয়ে তদন্ত চলমান: চেয়ারম্যান, রাকাব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) মূল কাজ দারিদ্র্য বিমোচনে কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া। কিন্তু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিশেষায়িত এ ব্যাংকটির কম সুদে ‘সস্তা ঋণ’ নিয়ে পদে পদে প্রতারণা ও নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন গ্রামের অসংখ্য নিরক্ষর অসহায় মানুষ। কাগজপত্রের মারপ্যাঁচে ফেলে তাদের কাছ থেকে দ্বিগুণেরও বেশি হারে সুদ আদায় করা হয়েছে। জেলের ভয় দেখিয়ে গ্রাহককে ৫ হাজার টাকা ঋণের বিপরীতে ৬১ হাজার টাকা পরিশোধে দেওয়া হয়েছে লাল নোটিস (ঋণ পরিশোধের সর্বশেষ ধাপ)। শুধু তাই নয়, ব্যাংকটির কোনো কোনো শাখায় গ্রাহক কিস্তির টাকা জমা দিলেও তা সমন্বয় না করে আত্মসাৎ করার ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি ঋণ েদওয়ার ক্ষেত্রেও মানা হয়নি বিধিবিধান।
ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে ঘটছে এসব অনিয়ম-দুর্নীতি। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আলাপ করে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন ও কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল অব বাংলাদেশ (সিএজি) অফিসের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে অনিয়মের এমন চিত্র।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন: সাম্প্রতিককালে তৈরি করা বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাকাবের ‘খাদ্য নিরাপত্তা’র জন্য গঠিত ৫ হাজার কোটি টাকা এবং ‘ঘরে ফেরা’ নামে ৫০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের (প্রকল্পের) তহবিল থেকে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ প্রদান করা হয়। পরে সাড়ে ১২ শতাংশ হারে আদায় করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গ্রাহকরা সস্তা সুদের সুবিধা ভেবে ঋণ নিলেও পরে দ্বিগুণ সুদ দিতে বাধ্য হয়েছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পরিদর্শনকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সুদের সুবিধা ভেবে ঋণ নিলেও পরে দ্বিগুণ সুদ দিতে বাধ্য হয়েছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পরিদর্শনকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা রাকাব কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চান, কোন ক্ষমতাবলে তারা এই বাড়তি সুদ আদায় করছে। জবাবে জানানো হয়, ১৯৮৭ সালের অর্ডারের ক্ষমতাবলে বাড়তি এই সুদ আদায় করা হচ্ছে। তবে পরিদর্শকরা রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক পরিচালনার জন্য ১৯৮৭ সালের অর্ডারের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাননি। রাকাবের পক্ষ থেকেও এ ধরনের কোনো অর্ডারের নথিপত্র দেখাতে পারেনি। বাস্তবে এ ব্যাংকটি ‘রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৬’ দিয়ে পরিচালনা হতো। কিন্তু ‘রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক অ্যাক্ট, ২০১৪’ পাস হওয়ার পরে ১৯৮৬ সালের বিধান অকার্যকর ও বাতিল হয়ে গেছে।
এ প্রসঙ্গে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মুহা. মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন আগামীর সময়কে বলেছেন, একটি আইন হওয়ার পর আগের অধ্যাদেশ স্বাভাবিকভাবে অকার্যকর হয়ে যায়। আর ভুয়া অধ্যাদেশ তো দেওয়ানি এবং ফৌজদারি অপরাধ। এ ধরনের কাজ অন্য আইনের প্রতি অবজ্ঞা। এটা কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি করতে পারেন না। এ ধরনের অপরাধে কমপক্ষে সাত বছর সাজার সুযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনে যেসব মন্তব্য: উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো ব্যাংক মূলধনের বিপরীতে সুদ-আসল মিলিয়ে তিন গুণের বেশি অর্থ আদায় করতে পারবে না। এমনকি তিন গুণ বা এর কাছাকাছি পরিমাণ বকেয়া হয়ে গেলে ব্যাংক চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ যোগ করতে পারবে না— এমন মন্তব্য করে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক্ষেত্রে রাকাব সুদ আদায়ে আইনের সরাসরি লঙ্ঘন করেছে। রাকাব কর্তৃপক্ষকে ভবিষ্যতে স্বচ্ছ ও সঠিক নীতিমালা অনুসরণে সতর্ক করা জরুরি।
সিএজির প্রতিবেদন: কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল অব বাংলাদেশ (সিএজি) কার্যালয়ের সর্বশেষ (২০২০-২১) প্রতিবেদন বলছে, রাকাবে বিভিন্ন গ্রাহকের কাছ থেকে জমার রসিদে আদায় করা অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা না করে জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি ডেটা এন্ট্রি অপারেটরের মাধ্যমে ভুয়া ঋণ সৃষ্টি, ঋণের মঞ্জুরিপত্রের শর্ত ভঙ্গ, গ্রাহকের কাছ থেকে ইচ্ছামতো সুদ আদায়, তথ্য গোপন করে খেলাপিকে ঋণ দিয়ে কমিশন গ্রহণ, স্বজনদের ঋণ দেওয়া, ভুয়া ওয়ারিশ সনদ দেখিয়ে তহবিল তছরুপ, জমির জাল দলিল নিয়ে ঋণ দেওয়া, নিকট আত্মীয়দের স্থায়ী আমানতের বিপরীতে অতিরিক্ত সুদ দেওয়াসহ অনিয়মের প্রমাণও মিলেছে। এরকম নানা জালিয়াতির কারণে ২০২০-২১ অর্থবছরে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ক্ষতি হয়েছিল ৮০ কোটি ৩১ লাখ ৫০ হাজার ৭৬৯ টাকা— উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
ভুক্তভোগীদের কষ্টের কথা: ব্যাংক থেকে সহজ সুদে ঋণ নিয়ে নানা হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হয়েছেন— এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। পদে পদে অসহনীয় কষ্টের কথা তুলে ধরেন তারা।
১. নওগাঁর সাপাহার উপজেলায় রাকাবের শাখার গ্রাহক মো. আব্দুর রব। ২০২৫ সালের ৩০ জুন ব্যাংকের কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্য বিমোচনে নেওয়া স্কিম (প্রকল্প) থেকে ২ লাখ টাকা ঋণ নেন। এই ঋণে সুদের হার নির্ধারণ করা ছিল ৬ শতাংশ। কিন্তু তার কাছ থেকে নানা ঘাট দেখিয়ে আদায় করা হয়েছে সাড়ে ১২ শতাংশ। দ্বিগুণের বেশি সুদের হারে ঋণ পরিশোধ করতে অবর্ণনীয় ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে— যোগ করেন আব্দুর রব। ২. সোহেল মিয়া লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলা রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের একজন গ্রাহক। তিনি ঋণের মঞ্জুরিপত্র অনুযায়ী কিস্তি দেন। কিন্তু ব্যাংকটির দুজন কর্মকর্তা কারসাজি করে তার ৮০ হাজার টাকা জমা করেননি। ফলে সোহেল মিয়াকে ঋণখেলাপি হিসেবে দেখানো হয়। তিনি ব্যাংকে ঋণখেলাপির কারণ জানতে গেলে মামলা দিয়ে জেলে পাঠানোর হুমকি দেওয়া হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বিশেষ অডিট চালায়। সেখানে ঘটনার প্রমাণ মেলে। পরে প্রতারক ব্যাংক কর্মকর্তা আজিজুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। মামলার পর আজিজুর রহমান এখন পর্যন্ত পলাতক। তবে গ্রাহক হিসেবে প্রতারণার বিচার পাননি সোহেল। ৩. ধনঞ্জয় রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের নীলফামারী সদর উপজেলার পলাশবাড়ী শাখার একজন গ্রাহক। তিনি ঋণ নেন মাত্র ৫ হাজার টাকা। ঋণ গ্রহণের পর থেকে দুই বছর ব্যাংকের কিস্তি দিতে ব্যর্থ হন। এতে ধনঞ্জয় ঋণখেলাপি হন। এরপর নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে থাকেন, যার অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ২০-২৫ হাজার টাকার বেশি। কিন্তু গত বছর ব্যাংক তাকে ‘লাল নোটিস’ দেয়। সেখানে ঋণের স্থিতি ৬১ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ধনঞ্জয় বললেন, ব্যাংক তাকে বারবার মামলা আর জেলের হুমকি দিচ্ছে। তাদের হাত-পা ধরেও কোনো লাভ হচ্ছে না। তার আক্ষেপ, ‘শুনেছি সরকার ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ এবং সুদ মওকুফ করেছে। তাহলে আমরা দেশের অন্য মানুষের মতো ঋণ মওকুফ সুবিধাও পাব না?’
রাকাবের বক্তব্য: রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আলী আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সরকারের খাদ্য উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে গৃহীত ঋণ প্রকল্পে মঞ্জুরিপত্রের ৬ শতাংশ ঋণের সুদের বদলে সাড়ে ১২ শতাংশ আদায় ব্যাংকিং নীতি পরিপন্থী। এতে সরকারের ঋণের লক্ষ্য ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। আর ৫ হাজার টাকার ঋণের জন্য ৬১ হাজার টাকা পরিশোধে লাল নোটিস যথাযথভাবে আবেদন করলে মওকুফ করে কমানো হয়। এখন তো সরকার তা মওকুফ করেছে। কিন্তু আইনের লঙ্ঘন করার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।’ তিনি জানালেন, লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় ঋণ সমন্বয় না করার অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অন্যদের বিষয়ে তদন্ত চলমান। ব্যাংকের পর্ষদেও এটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে ভুয়া অর্ডারে বেশি সুদ আদায়ের বিষয়টি তার জানা নেই বলে মন্তব্য করেন ড. মোহাম্মদ আলী।
যা বললেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র: রাকাবের নানা অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান আগামীর সময়কে বললেন, রাকাবে যা ঘটেছে তা রীতিমতো জালিয়াতি ও ফৌজদারি অপরাধ। গ্রাহকের ঋণের টাকা সমন্বয় না করাটা চরম ব্যাংকিং অনাচার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো দায় আছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে আরিফ হোসেন খান বলেছেন, ‘আমরা তো ব্যাংক অডিট করি না। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে কোনো অনিয়ম উঠে এলে তা অডিট করি। আর গ্রাহকের টাকা জমা না করলে ব্যাংকের উচিত ক্ষতিপূরণ দেওয়া।’




