অনিরাপদ খাদ্যে বাড়ছে দারিদ্র্যঝুঁকি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশে অনিরাপদ খাদ্য বাড়াচ্ছে দারিদ্র্যঝুঁকি। অর্থাৎ পেট ভরানোই যখন দুশ্চিন্তার, তখন খাদ্য নিরাপত্তার কথা অবান্তর হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে নানা ধরনের অনিরাপদ খাবার গ্রহণ করে অর্থাভাবে থাকা পরিবারগুলো। ফলে এ-সংক্রান্ত নানা রকম রোগে ভোগে তারা।
এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে চিকিৎসা ব্যয়ের পেছনেই একেকটি পরিবারের চলে যায় মোট আয়ের মোটা অঙ্কের অর্থ। আর এভাবে তাদের অবস্থার উন্নতি তো দূরের কথা, বরং নিচের দিকে নামতে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দারিদ্র্য বাড়ার কারণগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।
এ প্রসঙ্গে ইনস্টিনিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী আগামীর সময়কে বলেছেন, নিরাপদ খাদ্য পাওয়া জনগণের মৌলিক অধিকার। জনগণ যে খাদ্য কিনছে, সেটি যাতে নিরাপদ থাকে, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। এক্ষেত্রে খাদ্যে শুধু ভেজাল মেশানোই নয়, উৎপাদন পর্যায় থেকে খাদ্য অনিরাপদ হয়ে পড়ে। ফলে বিষাক্ত পদার্থ ও রাসায়নিকগুলো মানুষের দেহে যাচ্ছে। দরিদ্র মানুষ কম দামে খাদ্য কিনতে বাধ্য হয়; যার ফলে অনিরাপদ খাদ্য বেশি গ্রহণ করছে। এর প্রভাবে তাদের নানা রোগ হচ্ছে। এক্ষেত্রে একদিকে চিকিৎসা খরচ যাচ্ছে আয়ের বড় একটি অংশ, অন্যদিকে আয় করার সক্ষমতাও থাকে না। অসুস্থ থাকলে কাজে যেতে পারে না। আবার কর্মক্ষমতাও কমে যায়। এভাবে খাদ্যজনিত রোগে দরিদ্র জনগোষ্ঠী আরও দরিদ্র হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য ও নিরাপদ খাদ্যকর্মী মো. রেজাউল করিমের মতে, বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও মানবসৃষ্ট বিপত্তিজনিত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খল আজ বহুমুখী দোষে দুষ্ট। জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও জলবায়ুর অস্বাভাবিক অভিঘাতের কারণে খাদ্যশৃঙ্খল হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হচ্ছে অতিমাত্রায় সার, কীটনাশক ও বালাইনাশকের মতো বিভিন্ন রাসায়নিক।
অবৈজ্ঞানিক ও অসচেতনতার কারণে এসব উপাদান খাদ্যশৃঙ্খলে দ্রুত বা অনেক সময় স্থায়ীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। পরিবর্তনশীল খাদ্যব্যবস্থা খাদ্য নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, বিশ্ব খাদ্য সংস্থার তথ্যমতে, ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী বা রাসায়নিক পদার্থ ধারণকারী অনিরাপদ খাদ্য ডায়রিয়া থেকে ক্যানসারসহ ২০০টির বেশি রোগের কারণ হতে পারে। বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ৬০ কোটি মানুষ প্রতি বছর অনিরাপদ খাবার গ্রহণ করে অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ২৪ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে বিপর্যয়মূলক খরচের মধ্যে নিপতিত হচ্ছে। এ ছাড়া চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতি বছর ৬২ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে এবং অত্যধিক ব্যয়জনিত কারণে ১৬ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা করায় না।
গত ৮ মে প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ‘বাংলাদেশে প্রয়োজনী হয়ে স্বাস্থ্যসেবার অপূর্ণতা এবং ব্যক্তিগত ব্যয়ে চিকিৎসার গতি-প্রকৃতি’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ সাধারণ মানুষের জন্য ক্রমেই বড় সংকটে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী চিকিৎসা ব্যয়ের সবচেয়ে বড় চাপ বহন করছে। বলা হয়েছে, দারিদ্র্য পরিবারগুলো তাদের মোট আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করে। অন্যদিকে ধনী পরিবারগুলো খরচ করে তাদের আয়ের ৫ শতাংশ। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যব্যয়ের সবচেয়ে বেশি বহন করছে দরিদ্র পরিবারগুলোই। ফলে তারা আরও দরিদ্র হচ্ছে।
বিশেজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে একসময় দারিদ্র্য কমলেও এখন বাড়ছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো, খাদ্যজনিক সংক্রামক ও অসংক্রাম রোগ এবং এর ব্যয় মেটানোর চাপ। গত বছরের শেষ দিকে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে চার বছর ধরে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। অনুমিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬০ লাখ। ২০২২ সালে এ সংখ্যাটি ছিল ৩ কোটি ২০ লাখ। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ।





