বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক
পথের বাঁকে ৭০ ‘মৃত্যুফাঁদ’
- পাঁচ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২ হাজার ৪০০ মানুষ
- তিন-চতুর্থাংশই এ মহাসড়কে দুর্ঘটনার শিকার
- প্রতিদিন গড়ে ৩০ হাজার যানবাহনের চলাচল
- ২৪ ফুট সরু মহাসড়ক

সংগৃহীত ছবি
২০২২ সালের ২৯ মে ভোরে বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের উজিরপুরের সানুহার এলাকার বাঁকে একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন ১০ জন। এ ঘটনার দুই দিন পর একই স্থানে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন দুজন। এই বাঁকে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। সবশেষ গত ২৯ জুন রাতে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার পালরদী এলাকার তাঁত বোর্ডের সামনে পিকআপ ভ্যান ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন।
১৬৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের ৭০টি বাঁক মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। বরিশাল বিভাগে পাঁচ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, যার তিন-চতুর্থাংশই এ মহাসড়কে দুর্ঘটনার শিকার। বাসচালক এবং মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, এই মহাসড়কের বেশিরভাগ দুর্ঘটনাই ঘটছে এসব বাঁকে।
বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের উজিরপুরেই এমন বিপজ্জনক বাঁক কমপক্ষে আটটি। সানুহার ছাড়াও উপজেলার বামরাইল, নতুন শিকারপুর, জয়শ্রী ও ইচলাদী এলাকার বাঁকগুলোয় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন সানুহার বাজারের চা দোকানি মো. ছগির।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, উজিরপুরের এসব এলাকা ছাড়াও গৌরনদীর ভূরঘাটা ব্রিজ, ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ড, টরকী, আশোকাঠি, মাহিলাড়া, বাটাজোড়, কটকস্থল, বাবুগঞ্জের নতুনহাট, রহমতপুর, এয়ারপোর্ট মোড়, ক্যাডেট কলেজ, পাংশা, সাতমাইল, ছয়মাইল, বরিশাল সদরের গড়িয়ারপার, কাশিপুর, রেইন্ট্রিতলা, দপদপিয়া জিরো পয়েন্ট, নলছিটি জিরো পয়েন্ট, বাকেরগঞ্জের লক্ষ্মীপাশা, বোয়ালিয়া, ভরপাশা, চরামদ্দি, আমতলীর শাখারিয়া, ব্রিকস ফিল্ড, পটুয়াখালীর কলাপাড়ার মহিষাকাটা, চুনাখালী ও কেওড়াবুনিয়া এলাকার বাঁকে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। এতে প্রাণ হারাচ্ছেন অনেক মানুষ।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির বরিশাল বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক খন্দকার ইমাম হোসেন নাসির জানিয়েছেন, পটুয়াখালীর লেবুখালী এলাকার পায়রা সেতু থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকের সংখ্যা ৩০টি। বিশেষ করে শীত মৌসুমে ঘন কুয়াশার কারণে এসব বাঁকে দুর্ঘটনা ঘটে প্রায়ই। এতে দিন দিন বাড়ছে প্রাণহানির সংখ্যা।
তবে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের পটুয়াখালী কার্যালয়ের তথ্য, পায়রা সেতু থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক আছে ২০টি। এর মধ্যে কয়েকটি বাঁকের কাছে সতর্কতা চিহ্ন দেওয়া আছে। তবে বাঁক সোজা করার জন্য মন্ত্রণালয়ে জমা আছে একটি প্রকল্প। বাঁকগুলো সোজা করা হলে দুর্ঘটনা কমবে বলে মনে করেন সওজ পটুয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী জামিল আক্তার লিমন।
বরিশাল কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের অভ্যন্তরীণ রুটের বাসের সাবেক চালক কালাচাঁদ দাস জানালেন, বরিশালের নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে ভূরঘাটা, অর্থাৎ বরিশালের সীমানা পর্যন্ত মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক আছে প্রায় ৪০টি। এর মধ্যে ১৮ থেকে ১৯টি বাঁক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে বেড়েছে দ্রুতগতির যানবাহন চলাচল। ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে পার হয়েই ২৪ ফুট প্রস্থের সড়কে গাড়ি চালাতে হয়। তার ওপর সড়কে অনেক বাঁক।
বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি মোশাররফ হোসেন জানালেন, ভূরঘাটা থেকে বরিশাল কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল পর্যন্ত মহাসড়কের ৫৬ কিলোমিটারে বাঁকগুলোর কারণে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে। বাঁক পার হওয়ার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে বা যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটছে হতাহতের ঘটনা।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলাম জানালেন, তারা ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের বরিশালের অংশে চিহ্নিত করেছেন ৩৬টি বাঁক। ঝুঁকিপূর্ণ এসব এলাকার মহাসড়ক প্রশস্ত করা হয়েছে। অনেক স্থানে চলছে মহাসড়ক প্রশস্ত করার কাজ। তা ছাড়া দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় চালকদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে সাইনবোর্ড বা চিহ্ন। তিনি মনে করেন, তারপরও দুর্ঘটনা ঘটছে যানবাহনের দ্রুতগতি এবং চালকদের অসচেতনতার কারণে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, পদ্মা সেতু চালুর আগে ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের বরিশালের ভূরঘাটা থেকে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা পর্যন্ত (বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক) প্রতিদিন চলাচল করত ১৬ থেকে ১৯ হাজার যানবাহন। সেতু চালুর পর সেই সংখ্যা হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার।
বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, বরিশাল বিভাগে পাঁচ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানিয়েছেন, নিহতদের তিন-চতুর্থাংশই বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে দুর্ঘটনার শিকার। এ মহাসড়কে কিছু বাঁক রয়েছে একেবারে ইউ আকৃতির। দুর্ঘটনাপ্রবণ বাঁক থাকা সত্ত্বেও বাস কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতা এবং যানবাহন ঝুঁকি নিয়ে ওভারটেক করায় দুর্ঘটনা ঘটছে বেশি। অনেক জায়গায় সড়ক প্রশস্ত করেও কমছে না দুর্ঘটনা।
সাইদুর রহমান মনে করেন, দুর্ঘটনা কমাতে চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাস মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বরিশাল জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেছেন, বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কটি দুই লেনের এবং খুবই সরু। গড় হিসাবে এটি ২৪ ফুটের সড়ক। পদ্মা সেতু চালুর পর যানবাহন চলাচল প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে এ মহাসড়কে। এত সরু সড়কে যানবাহনের চাপের কারণে বাড়ছে দুর্ঘটনা।
যেসব এলাকা দুর্ঘটনাপ্রবণ, সেখানে প্রশস্ত করা হয়েছে সড়ক এবং এখনো চলছে সেই কাজ। পাশাপাশি বাজার এলাকাগুলোয় স্পিড ব্রেকার ও মোড়ে মোড়ে দেওয়া হয়েছে চিহ্ন। তার পরও দুর্ঘটনা কমছে না অসচেতনতার কারণে। ছয় লেনের সড়ক নির্মাণ করা হলে এ সড়কে প্রাণহানি অনেকাংশে কমবে বলে মনে করেন তিনি।





