কারখানার চাকা ধীর গাজীপুরে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত গাজীপুর মহানগরসহ পুরো জেলার জনজীবন। যখন-তখন থমকে যাচ্ছে কলকারখানার চাকা। কমছে উৎপাদন, ব্যাহত হচ্ছে রপ্তানি বাণিজ্য। সবচেয়ে বেশি ভুগছে শিশু, বৃদ্ধ ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। শহরের চেয়ে গ্রামের পরিস্থিতি আরও শোচনীয়। পল্লী বিদ্যুতের কাগজে-কলমের হিসাবের সঙ্গে মিল নেই বাস্তবতার। দিনে-রাতে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে গ্রাহকদের।
গাজীপুরে রয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার শিল্পকারখানা। বিদ্যুৎ সংকটে ব্যাহত হচ্ছে যেগুলোর উৎপাদন। ভোগড়া বাইপাস এলাকার প্রিন্ট এশিয়া কারখানার মালিক সৈয়দ হাসান সোহেল জানালেন, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে কারখানার উৎপাদন অর্ধেক কমে গেছে। জেনারেটর চালাতে গিয়ে বাড়ছে উৎপাদন খরচ। ফলে মাস শেষে গুনতে হচ্ছে লোকসান।
ইয়ান নিট কম্পোজিট কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ হাসান বলছিলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় শ্রমিকরা বেকার বসে থাকছেন, নষ্ট হচ্ছে দামি মেশিনপত্র।
সবচেয়ে বেশি সংকটে গ্রামের মানুষ। সন্ধ্যা নামলেই অন্ধকারে ডুবছে গ্রামের পর গ্রাম। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে। তীব্র গরমে হাসপাতালগুলোয়ও লোডশেডিং হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
গ্রাহকদের অভিযোগ, মিলছে না চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ, যা পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে ‘ভিআইপি’ ও প্রভাবশালীদের সামাল দিতেই হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের ফোনের কারণে আতঙ্কে দিন কাটছে পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও।
অটোরিকশাচালক আব্দুল মান্নান আগামীর সময়ের কাছে নিজের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে বলছিলেন, ‘সারা রাত চার্জ দিয়েও ব্যাটারি অর্ধেক পূর্ণ হয় না। দিনের অর্ধেক সময় পর আর গাড়ি চলে না। এনজিওর কিস্তি ও সংসারের খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’
এদিকে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে নষ্ট হচ্ছে ফ্রিজ, এসি ও মোটরের মতো ইলেকট্রনিক সামগ্রী। চান্দনা চৌরাস্তার মেকানিক লোকমান হোসেন জানালেন, গরম আসতেই নষ্ট চার্জার ফ্যান ও ফ্রিজ মেরামতের ভিড় বেড়েছে। অন্যদিকে, লোডশেডিংয়ের কারণে সড়কবাতি নিভে যাওয়ায় এলাকায় চুরি ও ছিনতাইয়ের আতঙ্ক বাড়ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, জেলায় বিদ্যুতের ঘাটতি ও সরবরাহের চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এ মোট চাহিদা ৫০৮ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ৩৮৬ মেগাওয়াট। ঘাটতি ১২২ মেগাওয়াট।
গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এ ১৪০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট। কালীগঞ্জ অঞ্চলে চাহিদা ৪০ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ১৮ থেকে ২০ মেগাওয়াট। কালিয়াকৈর অঞ্চলে ২০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে ১২০ মেগাওয়াট। শ্রীপুর ও মাওনা অঞ্চলে ১৫০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ৮০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট।
চাহিদা ও জোগানে সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকারও করলেন গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মহাব্যবস্থাপক আবুল বাশার আজাদ। বললেন, চাহিদার তুলনায় ১৫০ থেকে ১৭২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম সরবরাহ করা হয়। বিদ্যুৎ না পাওয়ায় গড়ে ৩০ শতাংশ লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এতে জেলায় গড়ে ৫-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।
যদিও পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের দেওয়া লোডশেডিংয়ের এমন পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাস্তবে মিল খুঁজে পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। বাস্তবে লোডশেডিং হয় ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা।




