ছেলের রক্তের বিচার চান শহীদ জিহাদের মা-বাবা

শহীদ জিহাদের মা-বাবা—ছবি: সংগৃহীত
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। দেশের রাজপথ তখন উত্তাল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাপে থমথমে ছিল রাজধানী ঢাকা। সেই রক্তাক্ত দিনেই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার সদর ইউনিয়নের দিগন্ত সড়ক এলাকার বাসিন্দা ও সরকারি কবি নজরুল কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী জিহাদ হোসেন।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও জিহাদ হোসেনের শূন্যতা মেনে নিতে পারেনি তার পরিবার। দিগন্ত সড়কের বাড়িটিতে আজও ছড়িয়ে আছে তার অসংখ্য স্মৃতি। ছেলের ছবির দিকে তাকিয়েই কাটে বাবা নুরুল আমিন মোল্লা ও মা শাহিনুর বেগমের প্রতিটি দিন। তাদের একটাই দাবি, জিহাদ হোসেন হত্যার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা।
পরিবার সূত্র বলছে, চার ভাই-বোনের মধ্যে জিহাদ হোসেন ছিলেন সবার ছোট। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন শান্ত, ভদ্র ও মেধাবী। উচ্চশিক্ষা শেষ করে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু ১৯ জুলাইয়ের সেই গুলিতে মুহূর্তেই থেমে যায় সব স্বপ্ন।
শাহিনুর বেগম দুঃখ প্রকাশ করে জানালেন, দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সন্তানের মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি তিনি। প্রতিটি সকাল শুরু হয় ছেলের স্মৃতি দিয়ে, আর প্রতিটি রাত শেষ হয় তার জন্য দোয়া করে।
তার দাবি, জিহাদ হোসেন হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একজন মা হিসেবে সন্তানের শূন্যতা কোনো দিন পূরণ হওয়ার নয়। তবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে অন্তত মনে হবে, তার ছেলের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি।
নুরুল আমিন মোল্লা জানান, জিহাদ হোসেনকে ঘিরে পরিবারের অনেক স্বপ্ন ছিল। লেখাপড়া শেষ করে পরিবারের হাল ধরবে, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে, এমন প্রত্যাশাই ছিল তাদের। কিন্তু একটি গুলি মুহূর্তেই সব স্বপ্ন ভেঙে দেয়।
তিনি দাবি করেন, ছেলেকে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তবে রাষ্ট্রের কাছে আমাদের একটাই আবেদন, জিহাদ হোসেন হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
জিহাদ হোসেনের বড় ভাই জানালেন, ছোট ভাইকে হারানোর শোক আজও পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে তাড়া করে বেড়ায়। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দিনের বিভীষিকা এখনো তাদের চোখে ভাসে। তার দাবি, শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মর্যাদা দিতে হলে শুধু স্মরণসভা নয়, হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচারও নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, জিহাদ হোসেন ছিলেন এলাকার গর্ব। একজন মেধাবী ও বিনয়ী শিক্ষার্থী হিসেবে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন তিনি। দেশ ও মানুষের জন্য কিছু করার স্বপ্ন নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু আন্দোলনের সেই রক্তাক্ত দিনে থেমে যায় তার জীবনের পথচলা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে জিহাদ হোসেনের পরিবার রাষ্ট্রের প্রতি আবারও ন্যায়বিচারের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, শুধু জিহাদ হোসেন নয়, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া প্রত্যেকের হত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্ন হবে। তাদের বিশ্বাস, বিচার নিশ্চিত হলেই শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে।
চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু মুছে শাহিনুর বেগম শেষবারের মতো আবেদন জানান, আমি আমার ছেলেকে আর ফিরে পাব না। শুধু চাই, আমার ছেলের রক্তের বিচার হোক। যেন আর কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি না হয়।




