১৫ প্রাণের স্বপ্ন বাড়ি ফিরল লাশ হয়ে
- টাঙ্গাইলে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা

স্বজনহারার আহাজারি - শফিক ছোটন
বাড়ি ফিরে বিয়ের আয়োজন করার কথা ছিল নওগাঁর মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের তরুণ তারেক হোসেনের (২১)। সেই আনন্দে উচ্ছ্বসিত ছিল তার পরিবার। ছেলের বিয়ে উপলক্ষে মেরামত করা হয়েছিল ঘরবাড়িও। কিন্তু সেই ঘরে আর থাকা হলো না তারেকের। গতকাল সোমবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে টাঙ্গাইলের কালিহাতীর দুর্ঘটনা তছনছ করে দিয়েছে তার পরিবারের স্বপ্ন। বাড়ি ফিরেছে তারেকের মরদেহ।
গতকালের ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় তারেকসহ নিহত হয়েছেন ১৫ জন। তাদের মধ্যে ৯ জনের বাড়িই রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে। দুদিন পর যে গ্রাম উৎসবে মাতার কথা ছিল, সেখানে আজ শুধুই মাতম। কম খরচে বাড়ি ফেরার চেষ্টায় লাশ হয়েছেন তারা।
রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের নিহত অন্য ব্যক্তিরা হলেন বাদশা মিয়া (৩০), আবদুল বারিক (২০), সোহাগ হোসেন (২১), রবিউল ইসলাম (২৮), সাগর হোসেন (২০), সহোদর মাইনুর রহমান (২৫), গিয়াস উদ্দিন (২২) ও সুজন আলী (৩৫)।
টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ বলছে, নিহতরা রডবোঝাই ট্রাকের ওপর ছিলেন। কম খরচে বাড়ি ফিরতে তারা আরোহী হয়েছিলেন ওই ট্রাকের। কালিহাতীর সরাতৈল এলাকায় ট্রাকটি উল্টে যায়। ট্রাকটি খাদে পড়ে দুমড়েমুচড়ে যায়।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে এলেঙ্গা ফায়ার সার্ভিস, যমুনা সেতু পূর্ব থানা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। ঘটনাস্থল থেকে ১৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং আহত অন্তত ১০ জনকে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়।
নিহতদের মধ্যে ৯ জন নওগাঁর। অন্যরা রাজশাহীর তানোর থানার বাতানপুর গ্রামের আলতাফ হোসেনের ছেলে ইসমাইল হোসেন (১৯), চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ থানার নজরুল (৬০) এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের মামুন (৪৫)। অন্যদের নামপরিচয় জানা যায়নি।
এদিকে, উদ্ধারকাজের কারণে ভোর সাড়ে ৪টা থেকে ৫টা ২০ মিনিট পর্যন্ত মহাসড়কের ঢাকামুখী লেনে যান চলাচল সাময়িক বন্ধ ছিল। পরে সেতু পূর্ব ভূঞাপুর লিংক রোড দিয়ে ঢাকাগামী এবং পুরনো সড়ক ব্যবহার করে উত্তরবঙ্গগামী যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
যমুনা সেতু পূর্ব থানার ওসি খন্দকার ফুয়াদ রুহানি জানান, বর্তমানে মহাসড়কে যান চলাচল আগের তুলনায় স্বাভাবিক রয়েছে। উদ্ধার অভিযান শেষ হয়েছে এবং এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকার ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করেন। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, চালক নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, নিহতরা মূলত বিভিন্ন এলাকা থেকে চুল সংগ্রহ করে বিক্রির কাজ করতেন। কম খরচে বাড়ি ফিরতে তারা ফেনীর মহাসড়ক থেকে রডবোঝাই একটি ট্রাকে নওগাঁর উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। দুর্ঘটনায় পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যদের হারিয়ে এখন দিশাহারা হয়ে পড়েছেন স্বজনরা।
গ্রামের বাসিন্দা আজহারুল ইসলাম জানালেন, একসঙ্গে এত মানুষের মৃত্যু এই গ্রামে আগে কখনো হয়নি। নিহতরা সবাই নিম্ন আয়ের মানুষ। আগে মাছ ধরে জীবিকা চললেও বিল শুকিয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে নোয়াখালীতে ফেরিওয়ালার কাজ করতে গিয়েছিলেন। গতকাল দুপুরে রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহত ব্যক্তিদের বাড়িতে মানুষের ভিড়। একই গ্রামের সাতজনের মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ এলাকাবাসী।
নিহত বাদশা মিয়ার স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন স্বামীর মৃত্যুর খবর শুনে মূর্ছা যাচ্ছিলেন বারবার। বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, ‘রাতে দুবার কথা হছে। বেটির (মেয়ে) জন্য খেলনা কিনিছে। সেই খবর শুনি বেটি কত খুশি! বাপে খেলনা নিয়ে আনোছে। এখন হামার ছাওয়ালেক কী জবাব দিমো। হামার ছাওয়াল কাক বাপ বলে ডাকবে? হামার কী হবে?’
নিহত মাইনুর ইসলামের চাচাতো ভাই রবিউল ইসলাম বললেন, ভাইয়ের সঙ্গে রবিবার বিকালে ফোনে তার কথা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, সোমবার রাতে ঈদ করতে ওরা বাড়িতে ফিরবেন। মাইনুর ভাইয়ের অসুস্থ মা-বাবা আছেন। তিন বছর বয়সী এক ছেলেসন্তান ও স্ত্রী আছে। পুরো পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। এখন তার মৃত্যুতে পুরো পরিবার অচল হয়ে যাবে।






