শ্রমিকের টাকা কার পকেটে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল প্রায় ২ কোটি টাকার প্রকল্প। কাগজে-কলমে ৪১৬ জন অতিদরিদ্র মানুষের কাজ পাওয়ার কথা ছিল। পরিকল্পনা ছিল প্রায় সাত কিলোমিটার খাল পুনঃখননের। যার মাধ্যমে দূর হবে কৃষিজমির জলাবদ্ধতা এবং সচল হবে পানি নিষ্কাশনের পথ।
কিন্তু রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার সেই প্রকল্প এখন স্থানীয়দের কাছে উন্নয়ন নয়, বরং অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে আলোচিত। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি যেন ‘খাল পুনঃখনন নয়, খাল চুরির প্রকল্প’।
তাদের অভিযোগ, প্রকল্পে শ্রমিক নিয়োগের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে এক্সকাভেটর। শ্রমিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক কর্মী ও সচ্ছল ব্যক্তিদের।
মধ্যঝিনা-মদাখালী হয়ে রনশীবাড়ি নদী পর্যন্ত খাল পুনঃখননের প্রকল্পটি শুরু হয় ৯ এপ্রিল। শেষ হয় ৬ জুন। কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়িত এ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ কোটি ৮০ লাখ ২৮ হাজার ২৩২ টাকা।
সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রায় ৮৯ লাখ ৫২ হাজার টাকা ব্যয় হওয়ার কথা ছিল শ্রমিকদের মজুরির জন্য। বাকি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় এক্সকাভেটর পরিচালনা ও অন্যান্য খাতে ব্যয়ের জন্য।
কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্প এলাকায় পুরো কাজই হয়েছে যন্ত্রের মাধ্যমে। মাঠপর্যায়ে শ্রমিকদের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে।
কোহিতপাড়া এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানার দাবি, তিনি প্রতিদিন ওই এলাকা দিয়ে যাতায়াত করেন। এক মাসেরও বেশি সময় চলা প্রকল্পে কোনো শ্রমিককে দেখেননি কাজ করতে।
খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে আজিজার রহমান নামে এক কৃষকের চোখেমুখে ছিল বিষণ্নতার ছাপ। তিনি বললেন, “খাল পুনঃখননের নামে হয়েছে বড় ধরনের ‘পুকুরচুরি’। স্থানীয় বিএনপি, যুবদল, জামায়াত ও আওয়ামী লীগের কিছু লোকজন মিলে লুটপাট করেছে বলে শুনছি।”
তার অভিযোগ, প্রকল্পের কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী না হওয়ায় কৃষিজমিতে তৈরি হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা। ‘আমার ৩০ বিঘা জমি আছে। এর মধ্যে ১২ বিঘা এক ফসলি। এখন যে কাজ হয়েছে, তাতে সারা বছর জমিতে পানি জমে থাকার আশঙ্কা আছে’— বললেন তিনি।
তালিকা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রকৃত দরিদ্র মানুষের পরিবর্তে শ্রমিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ব্যবসায়ী, সচ্ছল কৃষক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের। তালিকায় নাম রয়েছে মুদি দোকান মালিক রাজ্জাক, ব্যবসায়ী ভোদল, আকরাম এবং স্থানীয় বিএনপি নেতা মাজেদুর রহমানেরও।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির গঠন নিয়েও উঠেছে অভিযোগ। কমিটির সভাপতি মোবারক হোসেন মঞ্জু স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। সদস্য আব্দুর রহিম বিএনপির সমর্থক ও ইব্রাহিম হোসেন উপজেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি। আরেক সদস্য শাহাদত স্থানীয় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক। আর প্রকল্পের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জাতীয় রাজনীতিতে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এসব রাজনৈতিক পক্ষ কাজ করছে একসঙ্গে।
প্রকল্পের সভাপতি মোবারক হোসেন মঞ্জুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খননকাজে ব্যবহার করা হয়েছে ১৩টি এক্সকাভেটর। এর মধ্যে ইউপি সদস্য আব্দুর রহিম, যুবদল নেতা ফারুক এবং জামায়াত নেতা ইব্রাহিম হোসেন দিয়েছেন তিনটি করে। জেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন দিয়েছেন দুটি এবং উপজেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল দিয়েছেন একটি।
স্থানীয় বাসিন্দারা খালের পাশে দুটি বড় পুকুর দেখিয়ে অভিযোগ করেন, খাল খননের জন্য আনা কিছু এক্সকাভেটর রাতের বেলায় ব্যবহার করা হয়েছে স্থানীয় এক যুবলীগ নেতার পুকুর খননের কাজে। তাদের দাবি, দিনের বেলায় সরকারি প্রকল্প এবং রাতে ব্যক্তিগত কাজ— এভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যন্ত্রপাতি।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবু মুসা কাজীর তথ্য অনুযায়ী, খালের গভীরতা ১০ ফুট, তলদেশ ১২ ফুট এবং প্রস্থ ৩০ ফুট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে বাস্তব খননকাজের সঙ্গে নকশার মিল পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তাদের মতে, অনেক জায়গায় খালের তলদেশ ও কৃষিজমির উচ্চতা প্রায় সমান। প্রয়োজনীয় পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া এ ধরনের খনন বর্ষাকালে বাড়াতে পারে জলাবদ্ধতা।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি মোবারক হোসেন মঞ্জু। তিনি বললেন, ‘৪১৬ শ্রমিকের তালিকা পাঠানো হয়েছে ভুল করে। প্রতিদিন কাজ করেছেন ২৫০-৩০০ জন। কয়েকজন সচ্ছল ব্যক্তির নাম ভুলবশত তালিকায় থাকতে পারে। বিএনপি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগ নেতারা মিলে লুটপাট করেছেন— এ অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।’
তবে কমিটির সদস্য ও উপজেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি ইব্রাহিম হোসেনের দাবি ভিন্ন। তার ভাষ্য, ‘প্রকল্প শেষ হলেও কমিটির কোনো সভা হয়নি। আমি তিনটি এক্সকাভেটর দিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার খাল খনন করেছি। কিন্তু পেয়েছি মাত্র ৩ লাখ টাকা। সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেছেন সভাপতিই।’
অবশ্য অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নূর-এ শেফা। যদিও শ্রমিকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো হাতে পাননি তিনি। ‘যেসব স্থানে খাল ও জমির উচ্চতা সমান হয়ে গেছে, সেখানে ফের কাজ করা হবে’— বললেন এই কর্মকর্তা।




