পটুয়াখালীর বাউফল
ক্ষুধা লাগে, তবু খাবার চাইতে পারেন না তিন প্রতিবন্ধী ভাই

বাউফলে তিন প্রতিবন্ধী ভাই রিপন দাস, সাধন দাস ও নিদু দাস। ছবি: আগামীর সময়
ক্ষুধা লাগে, কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারেন না ‘আমাদের একটু খাবার দিন।’ পেটের জ্বালা সহ্য করে চুপচাপ বসে থাকেন। কেউ খাবার এনে হাতে তুলে দিলে খেয়ে নেন, আর না দিলে নীরবে অপেক্ষা করেন। পৃথিবীর কাছে তাদের চাওয়া-পাওয়া খুবই সামান্য শুধু দুমুঠো খাবার আর একটু মানবিকতার স্পর্শ।
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ধূলিয়া ইউনিয়নের চাদকাঠী গ্রামের দাসনগর এলাকার তিন প্রতিবন্ধী ভাই রিপন দাস (৪৫), সাধন দাস (৩৮) ও নিদু দাসের জীবন এখন অসহায়ত্বের এক করুণ প্রতিচ্ছবি। জন্ম থেকেই নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেড়ে ওঠা এই তিন ভাইয়ের মধ্যে সাধন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, আর রিপন ও নিদু বাক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তারা হয়তো পুরোপুরি বোঝেন না, কিন্তু মায়ের অনুপস্থিতির শূন্যতা ঠিকই অনুভব করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, তাদের সামনে যদি মূল্যবান কোনো জিনিসও রাখা হয়, তাতে কোনো আগ্রহ দেখান না তারা। নেই কোনো লোভ, নেই কোনো চাওয়া। তাদের একমাত্র প্রয়োজন একটু খাবার। কিন্তু সেই খাবারের জন্যও কারও কাছে হাত পাততে পারেন না। ক্ষুধার কষ্ট বুকের ভেতর চেপে রেখে দিনের পর দিন কাটিয়ে দেন।
একসময় বাবা রতন চন্দ্র দাস ও মা সরস্বতী রানীর স্নেহ-ভালোবাসার ছায়ায় কোনোমতে চলছিল তাদের জীবন। গত বছর বাবা মারা গেলে অসুস্থ শরীর নিয়েই তিন সন্তানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন মা সরস্বতী রানী। দীর্ঘদিন লিভার ও কিডনি রোগে ভুগলেও সন্তানদের ছেড়ে যাননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবনযুদ্ধে হার মেনে গত মাসে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন তিনি।
মায়ের মৃত্যুর পর যেন ভেঙে পড়ে তিন ভাইয়ের ছোট্ট পৃথিবী। স্থানীয়রা জানান, প্রায়ই তাদের মায়ের কবরের পাশে গিয়ে নীরবে বসে থাকতে দেখা যায়। হয়তো তারা ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন না, কিন্তু কবরের পাশে বসে মায়ের স্নেহ, ভালোবাসা আর নিরাপত্তার স্মৃতি খুঁজে ফেরেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ছয় ভাইবোনের মধ্যে বড় বোন প্রায় ২০ বছর আগে ভারতে চলে গেছেন। আরেক ভাই গজন দাস আলাদা থাকেন এবং তেমন খোঁজখবর নেন না। ছোট ভাই সুজন চন্দ্র দাস দিনমজুরের কাজ করে নিজের সংসার চালাতেই হিমশিম খান। তার স্ত্রী আঁখি দাস আগে ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। মায়ের মৃত্যুর পর তিন প্রতিবন্ধী ভাইয়ের দেখাশোনার জন্য তিনি বাড়িতে অবস্থান করছেন। কিন্তু সীমিত আয়ে নিজের সংসার চালিয়েই যেখানে কষ্ট, সেখানে তিন প্রতিবন্ধী ভাইয়ের দায়িত্ব বহন করা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবুও ভাইদের ছেড়ে যেতে চান না সুজন ও তার স্ত্রী আঁখি । চোখে জল নিয়ে আঁখি বললেন , ‘আমি কখনো তাদেরকে ফেলে দিতে পারবো না। আমার তিন ছেলে মেয়েকে এক মুট করে খাওয়াতে পারি ,তাদের মুখে দিয়ে তারপর খাওয়াবো যত কষ্টই হোক, ভাইদের ফেলে রাখব না। ভগবান যেন আমাকে একটুকু ভগবান দেয় ।’
এদিকে জরাজীর্ণ টিনের ঘরটিও এখন তাদের জন্য আরেক আতঙ্কের নাম। বর্ষার বৃষ্টি আর ঝড়ো হাওয়ায় ঘরটি যেন যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে দিন কাটছে তাদের।
প্রতিবেশী সঞ্চিতা পাল বলেছেন, ‘ওদের কোনো বোধশক্তি নেই। পচা-বাসি খাবার দিলেও খেয়ে ফেলে। সারাদিন কাজ করতে বললে কাজ করবে। বড় কাঠের টুকরো আনতে বললে আনবে, ১০ কলস পানি আনতে বললে তাও এনে দেবে। শুধু একটু খাবারের আশায় সবকিছু করে। কিন্তু কখনো কারও কাছে টাকা-পয়সা, কাপড় বা অন্য কিছু চায় না। ওদের সামনে হীরা, মুক্তা বা সোনা রেখেও লাভ নেই, ওরা ধরবে না। আমাদের বাড়িতে নিয়মিত আসা-যাওয়া করে, কিন্তু কোনো জিনিসে হাত দেয় না।’
আরেক প্রতিবেশী অমিত দাস বলেছেন, ‘গত বছরের নভেম্বর মাসে ওদের বাবা মারা যান। এরপর থেকেই পরিবারটির জীবনে নেমে আসে এক করুণ অধ্যায়। তিন প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে অনেক সংগ্রাম করে টিকে ছিলেন তাদের মা সরস্বতী রানী। কিন্তু চলতি বছরের ১৯ মে অসুস্থতার কারণে তিনিও মারা যান। মায়ের মৃত্যুর পর থেকেই ওদের জীবনে শুরু হয়েছে এক নিরবচ্ছিন্ন কষ্টের সময়। এখন তারা এক ধরনের হতাশা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।দারিদ্র্য যে কতটা নির্মম হতে পারে, দুমুঠো খাবারের জন্য মানুষের কতটা কষ্ট সহ্য করতে হয়, তা এই তিন ভাইকে না দেখলে বোঝা যাবে না।
এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মুশফিকুর রহমান বললেন, ‘তিন ভাইয়ের দুর্দশার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা তাদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছি। তারা বর্তমানে প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। তাদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে স্থায়ীভাবে গবাদিপশু প্রদান অথবা কোনো ক্ষুদ্র ব্যবসার ব্যবস্থা করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেছেন, ’প্রতিবন্ধী তিন ভাইয়ের বিষয়টি আমি জেনেছি। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। সংসদ সদস্য হিসেবে আমার এক মাসের সম্মানীর অর্থ তাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। পাশাপাশি তাদের বসবাসের ঘরটি সংস্কার বা উন্নয়নের ব্যবস্থা এবং নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।’






