আগামীর সময়

চট্টগ্রামে আলোচনায় তিন নাম, অটোরিকশা চালক বললেন, ‘মন্ত্রী বানাইলে ফাডাই ফালাইবু’

চট্টগ্রামে আলোচনায় তিন নাম, অটোরিকশা চালক বললেন, ‘মন্ত্রী বানাইলে ফাডাই ফালাইবু’

সিএনজিচালিত অটোরিকশা যাচ্ছে মইজ্জ্যারটেক থেকে কালারপোল সেতু হয়ে বোয়ালখালীর দিকে। স্থানীয় লোকজন সেগুলোকে বলে, ‘গ্রাম গাড়ি।’ অর্থাৎ তাদের শহরের ‘ভদ্রপাড়ায়’ প্রবেশের অনুমতি নেই। চালকের দুইপাশে, পেছনে ছয় যাত্রী নিয়ে গ্রামের আঁকাবাকা সড়ক ধরে এগিয়ে চলছে অটোরিকশা আর সবাই মিলে চলছে জম্পেশ আড্ডা। মন্ত্রীসভায় চট্টগ্রাম থেকে কার, কার ঠাইঁ হচ্ছে জল্পনার অন্তঃ নেই।

মাঝখান থেকে চালক বলে উঠলেন, ‘বদ্দা, খসরু সাব, নোমান সাবর পোয়া ইবে আর নাছির সাবর পোয়া ইবেরে মন্ত্রী বানাইলে ফাডাই ফালাইবু।’ অর্থাৎ খসরু সাহেব, নোমান সাহেবের ছেলে আর নাছির সাহেবের ছেলেকে মন্ত্রী বানালে তারা দক্ষতার সাথে কাজ করবেন। মুখ বাঁকা করে ভেংচি দেন যাত্রীদের মধ্যে বয়স্ক একজন, ‘তুই গাড়ি চালা, তারেক রহমান তোরে জিগ্যায়রে মন্ত্রী বানাইবু না’। (তুই গাড়ি চালাতে থাক, তারেক রহমান কী তোকে জিজ্ঞেস করে মন্ত্রী বানাবে!)

চালকের বলা খসরু সাহেব মানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি একাধিকবারের সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে অন্যতম। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসন থেকে আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

নোমান সাহেবের ছেলে মানে প্রয়াত বিএনপি নেতা আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে সাঈদ আল নোমান। নোমানের আসন চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং, হালিশহর, পাহাড়তলী) থেকে ছেলে সাঈদ এবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার দুই মেয়াদের সরকারে মন্ত্রী ছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক আবদুল্লাহ আল নোমান।

আর নাছির সাহেবের ছেলে মানে বিএনপির আরেক বর্ষীয়ান নেতা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীনের ছেলে ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। বয়সে তরুণ উভয়ে এবার প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৪টিতেই জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। তাদের মধ্যে কারা হচ্ছেন তারেকের সেনাপতি— তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেমন গুঞ্জনের শেষ নেই, তেমনি চায়ের দোকান, গণপরিবহন থেকে চেরাগি পাহাড়ে ‘ছত্রিশ রকমের’ মানুষের আড্ডায়ও তুমুল ঝড়।

নগরীর মোমিন রোডের বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী গলির মুখের চা-দোকানের মালিক শওকত। চট্টগ্রাম শহরের শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, সংবাদকর্মীদের অনেকের আড্ডা জমে তার দোকানে। গত (রবিবার) রাতের এক আড্ডায় শওকত শুধু সম্ভাব্য মন্ত্রীর নামই ঘোষণা করলেন না, একেবারে মন্ত্রণালয়ও ভাগ করে দিলেন। তার ভাষ্য, আমীর খসরু বাণিজ্যমন্ত্রী হবেন, সাঈদ আল নোমান শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আর মীর হেলাল বিমান প্রতিমন্ত্রী। ঠাট্টা করে একজন জানতে চাইলেন, ‘তারেক রহমানের সঙ্গে কী তোমার সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয়েছে ?’

সাধারণ মানুষের জল্পনা তো চলছেই, বিএনপিসহ রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যেও স্বাভাবিক কৌতুহল আর চাপা উত্তেজনার শেষ নেই। অনেকেই সংবাদকর্মীদের ওপর আস্থা রাখছেন, আবার অনেকে পত্রপত্রিকার ধারণা উড়িয়ে দিচ্ছেন।

এমনই এক আলোচনায় ওয়ান ব্যাংকের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘পত্রিকাগুলো যা লিখছে, ধারণার ওপর লিখছে। কারা মন্ত্রী হবেন, সেটা তারেক রহমান সাহেব ছাড়া আর কেউ জানেন বলে আমার মনে হয় না। মির্জা ফখরুল সাহেবদের মতো সিনিয়রদের কারও কারও সঙ্গে হয়তো পরামর্শ করতে পারেন। চট্টগ্রাম থেকে আমীর খসরু সাহেব ছাড়া আর কারো মন্ত্রী হওয়ার নিশ্চিত কোনো সম্ভাবনা আছে বলে আমার মনে হয় না।’

তবে চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি আলোচনা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সাঈদ আল নোমান আর মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনকে ঘিরেই। কেউ কেউ আবার হুম্মাম কাদের চৌধুরীর নামও আনছেন। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসি হওয়া সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম এবার প্রথম সংসদ সদস্য হয়েছেন। প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হওয়া আসলাম চৌধুরীকে নিয়েও অনেকের প্রত্যাশা, কিন্তু খেলাপি ঋণের জটিলতায় যার নির্বাচন করাই অনিশ্চিত ছিল, তাকে মন্ত্রীসভায় রাখা হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহও উঠে আসছে অনেক আলোচনায়।

২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রীসভায় চট্টগ্রাম থেকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা মিলে ছিলেন আটজন। এবারও সমসংখ্যক মন্ত্রী মিলবে এমন প্রত্যাশা বিশেষত বিএনপি নেতাকর্মীদের।

চট্টগ্রামের দুজন বিএনপি নেতার সঙ্গে এ নিয়ে কথা হলো। পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা নাম প্রকাশে আগ্রহী নন। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ১৭ বছর ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা ও যোগ্যতার বিচারে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী মন্ত্রী হবেন, এটা তারা নিশ্চিতভাবেই ধরে নিচ্ছেন। অক্সফোর্ডের ডিগ্রিধারী সাঈদ আল নোমান অন্তঃত প্রতিমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য আর মীর হেলাল তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন— এসব বিচারে তাদের নিয়ে আশা দেখছেন দুই বিএনপি নেতা। আর ১৭ বছরে আন্দোলন-সংগ্রামে অবদান এবং শেষমুহূর্তে মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়ায় গোলাম আকবর খোন্দকার বিশেষ সহানুভূতি পেতে পারেন বলেও তাদের ধারণা।

একজন বিএনপি নেতা বললেন, ‘আর তো মাত্র একটা রাত। আজকের রাতটা পার হলেই তো অনেককিছু ক্লিয়ার হয়ে যাবে।’

মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান হবে।

    শেয়ার করুন: