ইঁদুর মেরে মাসে আয় ৪০ হাজার টাকা

আসাদুজ্জামানের ইঁদুর মারার ফাঁদ
দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের কৃষক আসাদুজ্জামানের ইঁদুর মারার ফাঁদ যেন স্থানীয় কৃষকদের কাছে আশীর্বাদে পরিণত হয়েছে। নিজের জমি থেকে ইঁদুর নিধনের জন্য ফাঁদ তৈরি করলেও সেটি তার জীবিকা নির্বাহের পথ দেখিয়েছে। আসাদুজ্জামানের ফাঁদকে স্থানীয় কৃষকরা নাম দিয়েছেন ‘বাঁশের চোঙার ফাঁদ’। তার ফাঁদ ব্যবহার করে নিজেদের জমির ধান ও গাছ রক্ষা করছেন কৃষকরা।
দেশের শীর্ষ ধান ও চাল উৎপাদনকারী জেলা দিনাজপুরে ইঁদুরের কারণে প্রতিবছর বোরো ও আমন মৌসুমে শত শত মণ ধান নষ্ট হচ্ছে। এমনকি খেতের ধান গাছ কেটে নষ্ট করে দেয় ইঁদুর। ইঁদুরের কবল থেকে ধানের জমি বাঁচাতে কৃষকরা যুগে যুগে নানা কৌশল ব্যবহার করে আসছেন। এর মধ্যে বেশ কয়েক বছর ধরে কৃষকরা স্থানীয় প্রযুক্তি ‘বাঁশের চোঙা ফাঁদে’র আশ্রয় নিয়েছেন। এতে তারা দারুণ সুফল পাচ্ছেন। পাশাপাশি ইঁদুর মেরে প্রতিমাসে আসাদুজ্জামানের আয় হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা।
আসাদুজ্জামান চিরিরবন্দর উপজেলার সাইতারা ইউনিয়নের পূর্ব খোচনা গ্রামের ফজলুল হকের ছেলে। ওই গ্রামের ইয়াকুব আলী জানান, ‘ধানখেতে ইঁদুর আক্রমণ করলে এক বিঘা জমিতে (৪৮ শতাংশ) ২ থেকে ৫ মণ ধানের ক্ষতি হতে পারে। আসাদুজ্জামান ইঁদুর মারতে শুরু করায় এই এলাকায় ইঁদুরের উপদ্রব কমেছে। শত শত বিঘা জমির ধান রক্ষা পাচ্ছে। তিনি এখন আমাদের নয়নের মণি। যখনই খেতে ইঁদুরের উপদ্রব বাড়ে তখনই তাকে ফোন দিলে তিনি কাজ শুরু করে দেন।’
চিরিরবন্দর গ্রামের কৃষক শাহীন জানান, ‘আসাদুজ্জামান আমার দুটি খেতে ইঁদুর মারার জন্য ৩৯ টি ফাঁদ বসিয়েছে। এতে ৩২টি ইঁদুর মারায় তাকে আমি খরচ বাবদ ১৬০০ টাকা দিয়েছি। তিনি এখন এই কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করেন।’
এ বিষয়ে আসাদুজ্জামান বলেছেন, ‘আমার বাবা ফজলুল হক নিজের জমি ইঁদুরের উপদ্রব থেকে বাঁচাতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এক ব্যক্তির কাছ থেকে বাঁশের তৈরি চোঙা ফাঁদ তৈরি করা শেখেন। আমি বাবার কাছ থেকে এই ফাঁদ বানাতে শিখি। প্রথম দিকে ভাড়া দিতাম। কিন্তু তারা এর সঠিক ব্যবহার করতে পারত না। পরে নিজেই ভাড়ায় ফাঁদ বসানো শুরু করি। তখন ফাঁদে একটি ইঁদুর আটকা পড়লে ৩০ টাকা নিতাম। বর্তমানে ৫০ টাকা করে নিই।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০টি ফাঁদ বসাই। চলতি মৌসুমে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০টি পর্যন্ত ইঁদুর ফাঁদে আটকা পড়ে। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৩৫টি ইঁদুর আটকা পড়ার রেকর্ড আছে। গত মঙ্গলবার ৪০টি ফাঁদ বসিয়েছিলাম। গত বুধবার সকালে ফাঁদগুলো তুলে দেখি ৩২টি ইঁদুর আটকা পড়েছে। এতে ১ হাজার ৬০০ টাকা পেয়েছি। গড়ে প্রতি মাসে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করে থাকি, যা দিয়ে আমার তিন ছেলে-মেয়ের পড়ালেখাসহ ৬ জনের সংসার চলে যায়।’
এ ব্যাপারে আসাদুজ্জামানকে কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেছেন, ‘এ পর্যন্ত খেতে ইঁদুর নিধনের যতগুলো পদ্ধতি আবিষ্কার হয়েছে তার মধ্যে স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত এই বাঁশের ফাঁদ পরিবেশবান্ধব ও সবচেয়ে কার্যকর। আসাদুজ্জামান ইঁদুর নিধন করে কৃষকের ধান রক্ষা করছেন। এজন্য তাকে উপজেলা থেকে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। তিনি ইঁদুর নিধন করে যেমন জীবিকা নির্বাহ করছেন, তেমনি আদিবাসীরা তার কাছ থেকে ইঁদুর কিনে নিয়ে মাংসের চাহিদা পূরণ করছেন।’

