ভরা মৌসুমেও সাগরে ইলিশের আকাল
- ভোলায় লোকসানে আড়তদাররা
- জাল বিক্রি করে শোধ করছেন দেনা
- পেশা বদলের চিন্তা করছেন জেলেরা
- সরবরাহ কম থাকায় বেড়েছে দাম
- প্রভাব পড়ছে উপকূলীয় অর্থনীতিতে

ভরা মৌসুমেও বঙ্গোপসাগরে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। বছরের এ সময়টায় যখন মাছঘাটগুলো ট্রলার, জেলে আর ইলিশে সরগরম থাকার কথা, তখন ভোলার বিভিন্ন ঘাটে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। কয়েক দিন সাগরে অবস্থান করেও পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ায় ট্রলারের জ্বালানি, বরফ, খাদ্য ও শ্রমিকের খরচ তুলতে পারছেন না জেলেরা। টানা লোকসানের মুখে পড়ে অনেকেই লাখ লাখ টাকা দামের জাল কম দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন। কেউ কেউ পেশা বদলের কথাও ভাবছেন।
ভরা মৌসুমেও ইলিশের এমন সংকট ভোলার উপকূলীয় অর্থনীতিতে তৈরি করেছে নতুন অনিশ্চয়তা। জেলে, আড়তদার, শ্রমিক, বরফকল, পরিবহনসহ ইলিশনির্ভর পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়ছে এর প্রভাব।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে শুধু একটি মৌসুম নয়, দীর্ঘ মেয়াদে উপকূলের হাজারো পরিবারের জীবিকা পড়তে পারে আরও বড় সংকটের মুখে।
এ সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে জেলেদের ওপর। নূরনবী মাঝির ভাষ্য, ‘৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর থেকেই সাগরে পাওয়া যাচ্ছে না আশানুরূপ মাছ। ট্রলারের তেল, বরফ ও খাবারের খরচই উঠছে না। এভাবে চললে মাছ ধরা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। অনেক দেনা হয়ে গেছে। সেগুলো শোধ করাও এখন কঠিন। তাই জাল বিক্রি করে কিছুটা দেনা পরিশোধ করার চেষ্টা করছি।’
একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন আরেক জেলে মো. হাসান। তার দাবি, ‘আগে এ সময়ে সাগরে গেলে বেশি ইলিশ পাওয়া যেত। এখন জাল ফেলেও মিলছে না মাছ। এর সঙ্গে সাগরে মাছ ধরার নানা প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। ফলে সংসারের ব্যয় ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা।’
শুধু লোকসান নয়, দীর্ঘদিনের পেশা ছেড়ে দেওয়ার চিন্তাও দেখা দিয়েছে অনেকের মধ্যে। তাদের একজন মো. সোহেল। তিনি বলেছেন, ‘জাল কিনেছি লাখ লাখ টাকা খরচ করে। কিন্তু মাছ না পাওয়ায় এখন সেই জাল বিক্রি করার চিন্তা করতে হচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে অন্য কাজের দিকে যাচ্ছেন। এই পেশায় এখন টিকে থাকা কঠিন।’
ভোলার বিভিন্ন মাছঘাটে আগের মতো ইলিশের সরবরাহ নেই। মাছ কম আসায় ব্যবসায়ও দেখা দিয়েছে মন্দা।
আড়তদার মো. আবদুর রহিমের দাবি, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার ঘাটে ইলিশ অনেক কম। মাছ না পাওয়ায় জেলেরা সাগরে যাওয়াও কমিয়ে দিয়েছেন। আমরা জেলেদের টাকা দিয়েও পড়েছি বিপাকে।’
‘আগে যে পরিমাণ ইলিশ আসত, এখন এর অর্ধেকও নেই। সরবরাহ কম থাকায় বাজারে দামও বেড়েছে, ফলে ক্রেতারাও সমস্যায় পড়ছেন। জেলেদের পাশাপাশি আড়তদাররাও এখন ঋণের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন’— বলছিলেন আরেক আড়তদার মো. জাহাঙ্গীর।
মাঠপর্যায়ে ঘুরে দেখা চিত্রও জেলে ও আড়তদারদের বক্তব্যের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে। ভোলার দৌলতখান, ইলিশা, তুলাতুলি, নাছির মাঝির ঘাট, ভোলার খালসহ জেলার বিভিন্ন মাছঘাটে নেই আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য। মাছের বাক্সগুলো দীর্ঘ সময় খালি পড়ে থাকছে। দু-এক ঝুড়ি মাছ এলেও নেই আগের সেই হাঁকডাক কিংবা ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়।
জেলেদের অভিযোগ, মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। নদীতে মাছ ধরতে গিয়েও হতাশ হয়ে ফিরছেন অনেকে।
অবশ্য এ অবস্থার মধ্যেই উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে আশাবাদী মৎস্য বিভাগ। দপ্তরটির তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলায় ইলিশ আহরণ হয়েছিল ১ লাখ ৮১ হাজার ৩৪২ টন। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার টন।
তবে মাঠের বাস্তবতা ও সরকারি প্রত্যাশার মধ্যে ব্যবধানের বিষয়টি স্বীকার করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও। ভোলা সদর উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মেহেদী হাসান ভূঁইয়ার ভাষ্য, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, নদী ও সাগরের মোহনায় ডুবোচর সৃষ্টি এবং অতিরিক্ত মাছ আহরণের কারণে কমে গেছে ইলিশ।’ তবে তার আশা, আগস্ট মাস জুড়ে সরবরাহ বাড়তে পারে ইলিশের।






