রায়নগর ট্রিপল মার্ডার
চুরির উদ্দেশ্যে ঘরে ঢুকে তিনজনকে হত্যার দায় স্বীকার বাবুলের

রংমিস্ত্রি বাবুল মিয়া। ছবি: আগামীর সময়
সিলেট নগরের রায়নগর এলাকার মিতালী ১১১ নম্বর বাসায় তিনজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার রংমিস্ত্রি বাবুল মিয়া আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। চার দিনের রিমান্ড শেষে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা সুলতানার আদালতে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত জবানবন্দি দেন তিনি। আদালতে দেওয়া জবানবন্দির অনুলিপি এখনো গণমাধ্যমের হাতে আসেনি। তবে কোর্ট ইন্সপেক্টর মাহবুবুর রহমান রাতে সাংবাদিকদের বলেছেন, বাবুল নিজেই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে এর বেশি কিছু বলতে চাননি তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল বলেছেন, বাসা ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে তিনি ওই বাসায় চুরি করতে ঢুকেছিলেন। বাসায় প্রবেশের পর গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের কাছে ধরা পড়ে যান তিনি। এরপর নিজের অপরাধ আড়াল করতে একে একে তাহমিনা বেগম, গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তারকে ছুরি মেরে হত্যা করেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, সকাল ৯টা ২৬ মিনিটের পর বাবুলকে বাসাটির মূল গেট দিয়ে প্রবেশ করতে দেখা যায় সিসিটিভি ফুটেজে। বাবুলের ভাষ্য অনুযায়ী, বাসায় ঢোকার পরপরই গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তার মুখোমুখি হয়। তাকে দেখে তাহমিনা পালানোর চেষ্টা করলে বাবুল পেছন থেকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন। পরে মৃত্যু নিশ্চিত করতে আরও কয়েকবার ছুরি মারেন। তাহমিনার চিৎকার শুনে পাশের কক্ষ থেকে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম ছুটে আসেন। তিনি বাবুলকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় ছুরির আঘাতে সুরাইয়া বেগমের গলায় জখম হয়। পরে তাকেও কয়েকবার ছুরি মারেন। সবশেষে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তারকেও ছুরি মেরে হত্যা করেন বলে জানান তিনি।
তিনজনকে হত্যার সময় বাবুলের নিজের হাত ও আঙুলেও আঘাত লাগে। পরে তিনি বাথরুমে গিয়ে শরীর, পরনের পোশাক ও ছুরিতে লেগে থাকা রক্ত পরিষ্কার করেন। এরপর বাসার আলমারি ও ওয়ার্ডড্রব খুঁজে ১৫ হাজার টাকা পান।
পুলিশ সূত্র জানায়, আরও কিছু নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন বাবুল। এমন সময় দরজায় নক করার শব্দ শুনে আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত বাসা থেকে বেরিয়ে যান তিনি।
পুলিশের ভাষ্য, যে পথ দিয়ে বাসায় প্রবেশ করেছিলেন, বেলকনি হয়ে সানশেড দিয়ে নিচে নেমে একই পথে বেরিয়ে যান বাবুল। পালিয়ে যাওয়ার সময় হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি কোনো এক স্থানে ফেলে দেন। তবে এখনো সেই ছুরি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার সময় এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় বাসার মূল গেটের সিসিটিভি ক্যামেরায় বাবুলের বের হওয়ার দৃশ্য ধরা পড়েনি। তবে রায়নগর মিতালী ৮৩ নম্বর বাসার একটি ক্যামেরা আইপিএসের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় সেটি সচল ছিল। ওই ক্যামেরার ফুটেজে ঘটনার ২০ থেকে ২৫ মিনিটের মধ্যে বাবুলকে টিভি গেটের গলি দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। ফুটেজে তাকে অস্থির অবস্থায় ছুটে যেতে দেখা যায়। এ সময় নিজের হাতের দিকেও বারবার তাকাতে দেখা যায় তাকে।
পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বাবুলকে শনাক্ত করা হয়। হত্যাকাণ্ডের মাত্র পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে।
তবে গ্রেপ্তারের পর বাবুল পুলিশকে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রথমে তিনি দাবি করেছিলেন, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ঘটনার দিন সকালে বাসায় গিয়ে শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব দিলে বাধা দেন তাহমিনা। এ নিয়ে ঝগড়ার একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ছুরি মেরে হত্যা করেন বাবুল। পরে তাহমিনার চিৎকার শুনে সুরাইয়া বেগম ও আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাদেরও একই পন্থায় ছুরি মেরে খুন করেন বলে পুলিশকে জানিয়েছিলেন তিনি।
বাবুলের ওই বক্তব্য যাচাই-বাছাইয়ের আগেই তা গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ায় হত্যাকাণ্ডের মোটিভ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। পরে পুলিশও প্রেমের সম্পর্কের মোটিভ থেকে সরে এসে বাবুলের সঙ্গে তাহমিনার পরিচয় ছিল বলে জানায়। ঘটনাস্থলে বাসার কাগজপত্র ও দলিলপত্র তছনছ অবস্থায় পাওয়া এবং আলমারি খোলা থাকার বিষয়টিও সামনে আসে। ফলে শুধু প্রেমের সম্পর্কের কারণে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এদিকে নিহত দম্পতির সন্তানরা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরে বাবা-মায়ের মরদেহ দাফন সম্পন্ন করেছেন। পরে নিহত দম্পতির মেয়ে সেলিনা সুলতানা সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় এজাহার দায়ের করেন। এজাহারে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে সিলেট বারের আইনজীবী সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে বিরোধের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে বলেও সন্দেহ প্রকাশ করেন সেলিনা সুলতানা। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন ও জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানান তিনি।
পুলিশের দাবি, চুরি করা ১৫ হাজার টাকা বাবুল বাসা ভাড়ার জন্য ব্যবহার করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বাসা ভাড়ার টাকা জোগাড় করতেই তিনি চুরির পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং নিজের অপরাধ গোপন করতে একে একে তিনজনকে হত্যা করেন।
তবে আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দির পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাওয়া গেলে তার বক্তব্যের বিস্তারিত জানা যাবে। একই সঙ্গে পুলিশকে দেওয়া আগের বক্তব্যের সঙ্গে আদালতের জবানবন্দির মিল-অমিলও যাচাই করা সম্ভব হবে। হত্যাকাণ্ডের পেছনে চুরিই একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল, নাকি এর সঙ্গে অন্য কোনো মোটিভ জড়িত, তা নিশ্চিত করতে তদন্তের পরবর্তী ধাপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।








