যেখানে ঝরেছিল রক্ত, সেখানে এখন স্বাভাবিক জীবন

সিলেট নগরীর রিকাবীবাজারের জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। ছবি: আগামীর সময়
দুই বছর আগে এই শহরের কয়েকটি সড়ক ছিল আতঙ্ক, সংঘর্ষ আর রক্তাক্ত ঘটনার সাক্ষী। যে মোড়গুলোতে একসময় ভেসে উঠেছিল স্লোগান, মানুষ ছুটেছিল জীবন বাঁচাতে, সেখানেই এখন চলছে স্বাভাবিক যানচলাচল। ব্যস্ত নগরজীবনের কোলাহলের আড়ালে যেন চাপা পড়ে আছে সেই রক্তাক্ত স্মৃতি।
‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে সিলেট নগরীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ঘুরে দেখা গেছে, সময় বদলেছে, দৃশ্যপটও পাল্টেছে। তবে প্রত্যক্ষদর্শী, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের স্মৃতিতে এখনও স্পষ্ট সেই দিনগুলোর ভয়াবহতা।
নগরীর রিকাবীবাজারে জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে সকাল থেকেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। চারপাশে এখন শান্ত পরিবেশ। কিন্তু স্থানীয়দের ভাষ্য, এই এলাকার বাতাসে এখনও যেন ভেসে আসে সেই দিনের বিভীষিকার স্মৃতি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী রফিক উদ্দিন বললেন, ‘আজ সব স্বাভাবিক মনে হলেও সেদিনের দৃশ্য ভুলে থাকা সম্ভব নয়। মানুষ দৌড়াচ্ছিল, চারদিকে ছিল আতঙ্ক। আগস্ট মাস এলেই সেই দিনের কথা মনে পড়ে যায়। দোকান খুলে বসি, কিন্তু চোখের সামনে ভেসে ওঠে মানুষের ছোটাছুটি আর আতঙ্কের দৃশ্য।’
নগরীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা চৌহাট্টা এখন প্রতিদিনের মতোই যানজটে মুখর। দোকানপাট খোলা। তবে আন্দোলনের সময় এই এলাকাও ছিল উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু।
স্থানীয় পথচারী খালিক মিয়ার ভাষ্য, যারা সেদিন এখানে ছিলেন, তাদের কাছে এই জায়গার অর্থ শুধু একটি মোড় নয়, একটি ইতিহাস। আজ এখানে যানজট, মানুষের ভিড়—সবই স্বাভাবিক। কিন্তু দুই বছর আগে এই জায়গার চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সেদিন সংঘর্ষ ও উত্তেজনায় থমকে যাওয়া নগরীর বন্দরবাজার ও কোর্ট পয়েন্টে এখন স্বাভাবিক ছন্দ ফিরেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে আগের মতোই। তবে অনেক দোকানি জানান, আগস্ট এলেই সেই দিনের স্মৃতি নতুন করে নাড়া দেয়। যারা সেদিন এখানে ছিলেন, তাদের কাছে এই জায়গাটা শুধু একটি বাজার নয়, অনেক স্মৃতির জায়গা।
নগরের কোর্ট পয়েন্টে যাত্রীর অপেক্ষায় থাকা রিকশাচালক আরিফ উদ্দিন বলেছেন, "সেদিন যাত্রী নয়, মানুষকে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দেওয়াই ছিল সবচেয়ে বড় কাজ। আজ যখন এই সড়ক দিয়ে যাই, তখন সেই দিনের কথাই মনে পড়ে।"
তরুণ স্বেচ্ছাসেবক নোমান বিন আলম স্মৃতিচারণ করলেন, আহতদের হাসপাতালে নেওয়া, রক্তের ব্যবস্থা করা—সবকিছু যেন এখনও চোখের সামনে ভাসে। তখন বুঝেছিলাম, সংকটের সময় মানুষই মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসা।
গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলার যেসব এলাকায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল, সেখানেও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চলছে। তবুও শহীদ পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে দিনটি কেবল একটি তারিখ নয়; এটি তাদের ব্যক্তিগত শোক ও গর্বের অংশ।
গোলাপগঞ্জ উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের শহীদ নজমুল ইসলামের (২২) পরিবারের এক সদস্য মন্তব্য করেন, প্রতিটি আগস্ট আমাদের জন্য নতুন করে কষ্টের মাস। তবে মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা আমাদের শক্তি দেয়। সেই দিনের স্মৃতি কখনও মুছে যাবে না।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহমুদ রাসেল জানান, আমরা চাই সেদিন কী ঘটেছিল তা নতুন প্রজন্ম জানুক।কেন ঘটেছিল এবং কী শিক্ষা রেখে গেছে তাও তারা জানুক।
সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী তাহমিনা জামান উল্লেখ করেন, আমাদের অনেকেই তখন ছোট ছিলাম। এখন বড় হয়ে সেই সময়ের গল্প শুনি। ইতিহাস যেন শুধু বইয়ে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটাই চাওয়া।
প্রবীণ নাগরিক আজিজুল হক চৌধুরী জানালেন, সময় বদলেছে, শহরও বদলেছে। কিন্তু যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের পরিবার তো সেই শূন্যতা নিয়ে এখনও বেঁচে আছে। একটি শহরের ইতিহাস শুধু ভবন বা রাস্তা দিয়ে তৈরি হয় না। মানুষের ত্যাগ, সংগ্রাম আর স্মৃতিও সেই ইতিহাসের অংশ। সেদিন পরিবারের সবাইকে নিয়ে খুব উদ্বেগে ছিলাম। এখন পরিস্থিতি শান্ত হলেও আগস্ট এলেই সেই ভয় আর উৎকণ্ঠার কথা মনে পড়ে।
স্থানীয়দের অনেকে মনে করেন, শুধু বার্ষিক শ্রদ্ধা নিবেদন নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণে উদ্যোগ প্রয়োজন। তারা জানান, যেসব স্থানে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে, সেখানে তথ্যফলক, স্মারকচিহ্ন কিংবা সংক্ষিপ্ত ইতিহাস সংবলিত সাইনবোর্ড স্থাপন করা হলে নতুন প্রজন্ম সহজেই সে ইতিহাস জানতে পারবে।
সময় অনেক ক্ষত মুছে দেয়, কিন্তু ইতিহাসকে মুছে দিতে পারে না। পথচলার ভিড়ের মধ্যেও শহরের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে এমন কিছু স্মৃতি, যা সিলেটের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কথা নীরবে মনে করিয়ে দেয়।









