যুবদল নেতার চেম্বারে চোর সন্দেহে ৪ যুবককে মারধর, কাটা হলো চুল

যুবদল নেতার চেম্বারে যুবকদের মারধর— ভিডিও থেকে নেওয়া
রাত তখন গভীর। রাজশাহী নগরীর ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের একটি চেম্বারে আনা হয় চার যুবককে। অভিযোগ, তারা চুরি করেছে। কিন্তু পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার আগে শুরু হয় ‘বিচার’। কাঠের ফালি দিয়ে চলে এলোপাতাড়ি মারধর। আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। একপর্যায়ে চারজনের চুল কেটে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, পুরো ঘটনাটি মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণও করা হয়। এমন ঘটনাই ঘটেছে রাজশাহী মহানগর যুবদলের সদস্য ও ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী শাকিলুর রহমান রনের চেম্বারে।
মঙ্গলবার রাতে সংঘটিত এ ঘটনার একটি ভিডিও আগামীর সময়ের হাতে এসেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, নগরীর বিমানচত্বর এলাকায় অবস্থিত ‘রাজু চা স্টল’ থেকে সিগারেটের প্যাকেট ও কিছু নগদ টাকা চুরির অভিযোগ ওঠে। এরপর আব্দুস সামাদ, দেবসহ চার যুবককে চুরির সন্দেহে ধরে এনে শাকিলুর রহমান রনের চেম্বারে নেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, যুবদল নেতা রনের উপস্থিতিতে ১৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য হাসান, মিন্টুসহ কয়েকজন যুবক কাঠের ফালি দিয়ে চারজনকে বেধড়ক মারধর করেন। পরে মিন্টুসহ অন্যরা তাদের মাথার চুল কেটে দেন। পুরো ঘটনাটি মোবাইল ফোনে ধারণ করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, পরে মারধরের শিকার চার যুবককে শাহ মখদুম থানায় সোপর্দ করা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, চার যুবককে একে একে মারধর করা হচ্ছে। তারা ব্যথায় চিৎকার করছেন, দয়া ভিক্ষা চাইছেন। কিন্তু মারধর থামছে না। একপর্যায়ে তাদের মাথার চুল কেটে দেওয়া হয়। পুরো ঘটনাটি ঘিরে উপস্থিত কয়েকজনকে ভিডিও ধারণ করতেও দেখা যায়।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত বিএনপি নেতা হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদককে বললেন, ‘আমি মোটরসাইকেলে আছি। আপনার কথা বুঝতে পারছি না। পরে আপনার সঙ্গে কথা বলছি।’ অন্যদিকে, যে চেম্বারে ঘটনাটি ঘটেছে, সেই মহানগর যুবদলের সদস্য শাকিলুর রহমান রনের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
১৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সদস্যসচিব মো. বেলাল বলেছেন, ‘যে চারজনকে চেম্বারে নিয়ে এসে মারা হয়েছে, তারা ওই এলাকার চিহ্নিত চোর বলে সবাই জানে। বিভিন্ন বাড়ি ও দোকানে চুরির অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তবে চেম্বারে এনে এভাবে মারধর করে চুল কেটে দেওয়া ঠিক হয়নি। আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। পরে বিষয়টি শুনেছি।’
রাজশাহী মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মো. শরিফুল ইসলাম জনি বলেছেন, ‘আমি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই। খোঁজ-খবর নিয়ে পরে জানাতে পারব। এমন ঘটনা ঘটে থাকলে তদন্ত করে সাংগঠনিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আরএমপির শাহ মখদুম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন বললেন, ‘চোর সন্দেহে স্থানীয়রা চারজনকে মারধর করে থানায় সোপর্দ করেন। এ ঘটনায় রাতেই একটি মামলা হয়েছে। এই মামলায় আজ বুধবার তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেছেন, ‘তারা চুরির ঘটনায় জড়িত এমন অভিযোগ রয়েছে এবং সেই অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা হয়েছে। তবে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে মারধর করা অন্যায়। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কেউ অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকা জুড়ে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার বিচার করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালতের। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে মারধর, অপদস্থ বা শাস্তি দেওয়ার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের নেই। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এমন প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দিতে পারে বলেও মত দিয়েছেন তারা।





