আগুনে বাড়ছে মৃত্যু, নেই বার্ন ইউনিট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঘনবসতিপূর্ণ ও শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জে একের পর এক অগ্নিকাণ্ড এবং বিস্ফোরণে বাড়ছে প্রাণহানি। গ্যাসের লিকেজ, বৈদ্যুতিক গোলযোগ ও বিভিন্ন ধরনের বিস্ফোরণে মানুষ দগ্ধ হলেও নেই পূর্ণাঙ্গ বার্ন ইউনিট। ফলে গুরুতর দগ্ধ রোগীর জরুরি চিকিৎসার জন্য ছুটতে হয় রাজধানীতে। চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনেই অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু হয়েছে অন্তত পাঁচজনের। অথচ দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক সমাজ, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের দাবির পরও গড়ে ওঠেনি বিশেষায়িত বার্ন চিকিৎসার ব্যবস্থা।
ফায়ার সার্ভিসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত সাড়ে তিন বছরে নারায়ণগঞ্জে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৯৩৩টি। এসব ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। এ সময় গ্যাস সরবরাহ লাইনের লিকেজ থেকে প্রায় ৫০০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। শুধু চলতি বছরের জুলাইয়ে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে ৭৯টি।
এর বাইরে বৈদ্যুতিক গোলযোগে ৫৯৭টি, বিড়ি-সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরো থেকে ১৭৫, গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে ২৯, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৯, বয়লার বিস্ফোরণে ১১, মাটির চুলা থেকে ৪২, কয়েল থেকে ১১ এবং রাসায়নিক বা কেমিক্যাল থেকে আগুনের ঘটনা ঘটেছে ৪টি।
তবে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা ও আর্থিক ক্ষতির হিসাব থাকলেও আগুনে দগ্ধ হয়ে পরবর্তী সময়ে কতজনের মৃত্যু হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব ফায়ার সার্ভিসের কাছে নেই। কারণ দুর্ঘটনার পর গুরুতর দগ্ধ রোগীদের প্রায় সবাইকে ঢাকায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়।
অতীতের কয়েকটি বড় দুর্ঘটনা দেখিয়েছে, গ্যাস ও আগুনের ঝুঁকি এ জেলায় কতটা ভয়াবহ হতে পারে। শুধু তিতাস গ্যাসের লাইনের ত্রুটিজনিত অগ্নিকাণ্ডে ২০২২ সালে ১৮ এবং ২০২১ সালে মৃত্যু হয়েছিল ২০ জনের। ২০২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর শহরের পশ্চিম তল্লার বায়তুস সালাত জামে মসজিদে গ্যাসের ত্রুটি থেকে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে মারা যান ৩৪ জন। এর পরের বছর, ২০২১ সালের ৮ জুলাই রূপগঞ্জের হাশেম ফুড কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছিলেন ৪৪ জন।
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফীন মনে করেন, ৩০০ শয্যার হাসপাতালের মতো কোনো স্থানে একটি বার্ন ইউনিট থাকলে তা অবশ্যই ভালো হতো। অগ্নিকাণ্ডের কারণগুলো তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ‘অনেক দুর্ঘটনা ঘটে ঘরের ভেতর গ্যাস জমে থাকার কারণে। রাইজার খোলা বা ঢিলে থাকা, পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন না থাকা এবং রান্নাঘরে জানালা না থাকার মতো বিষয়গুলোও ঝুঁকি বাড়ায়। জমে থাকা গ্যাসে আগুন লাগলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেখানে থাকা মানুষ ভয়াবহভাবে দগ্ধ হতে পারেন। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া না গেলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও কমে যায়।’
ফায়ার সার্ভিসের এ বক্তব্যের সঙ্গে গ্যাস কর্তৃপক্ষের বক্তব্যেও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গুরুত্ব পেয়েছে সতর্কতার বিষয়টি। নারায়ণগঞ্জ তিতাস গ্যাসের উপমহাব্যবস্থাপক মনজুর আজীজ মোহনের ভাষ্য, ‘তিতাস কর্তৃপক্ষ বাইরের পাইপলাইন থেকে রাইজার পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে। চোরাই গ্যাস সংযোগ দিতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। অবৈধ সংযোগের সময় নিম্নমানের সামগ্রী ও ত্রুটিপূর্ণ ওয়েল্ডিং ব্যবহারের কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটে।’
তিনি মনে করেন, বাসাবাড়ির ভেতরের দুর্ঘটনার দায় মূলত গ্রাহকের। ঘরে ঢোকার আগে গ্যাসের গন্ধ আছে কি না নিশ্চিত হওয়া, চুলা ঠিকমতো বন্ধ রাখা এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করলে প্রায় ৭০ শতাংশ দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তবে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সতর্কতার পাশাপাশি দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল-আমিন জানিয়েছেন, খানপুর হাসপাতালে কয়েকটি বার্নশয্যা চালুর কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। বার্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালোভাবে তোলা হবে।
জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারাও বার্ন চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছেন। তবে বাস্তবায়নের বিষয়ে এখনো হয়নি দৃশ্যমান অগ্রগতি। ‘সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে সরকারের কাছে তুলে ধরা হবে বিষয়টি’— বললেন জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির।
বার্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সিভিল সার্জন এ এফ এম মুশিউর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘উপজেলা হাসপাতালগুলো ৫০ থেকে ১০০ শয্যায় এবং জেলা হাসপাতাল ১০০ থেকে ২০০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তখন এসব হাসপাতালে ১০ শয্যা করে বার্ন ইউনিট রাখার প্রস্তাব রয়েছে।’






