একই আঙিনায় আজান-শঙ্খধ্বনি, সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত চারঘাটে

ছবি: আগামীর সময়
একই আঙিনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ ও মন্দির। একদিকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি, অন্যদিকে শোনা যায় শঙ্খধ্বনি। মসজিদে নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। মন্দিরে পূজা-অর্চনায় মগ্ন হন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। অথচ পাশাপাশি দুই উপাসনালয় ঘিরে নেই কোনো বিরোধ। আছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব আর ভ্রাতৃত্বের বন্ধন।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার পশ্চিম ঝিকরা গ্রামের চিত্র এটি। বড়াল নদের পাড়ঘেঁষা এই গ্রামে ধর্মীয় সম্প্রীতি যেন প্রতিদিনের জীবনের অংশ। ধর্ম আলাদা হলেও গ্রামের মানুষের পরিচয় একটাই- তারা একই জনপদের বাসিন্দা।
গ্রামের কর্মকারপাড়ায় প্রায় দুই দশক আগে, ২০০৫-০৬ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি কালীমন্দির। সেই থেকে সেখানে কালীপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজন হয়ে আসছে। পরে ২০২১ সালে মন্দিরের পাশেই স্থানীয়দের উদ্যোগে গড়ে তোলা হয় পশ্চিম ঝিকরা জামে মসজিদ।
একই আঙিনায় দুই ধর্মের উপাসনালয় নির্মাণের পর কারও কারও মনে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ধর্মীয় আচার পালনের সময় কোনো সমস্যা হবে কি না, তা নিয়ে ছিল প্রশ্ন। তবে গত পাঁচ বছরে সেই আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নেয়নি। বরং দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে গড়ে উঠেছে আরও নিবিড় সম্পর্ক।
মন্দিরের সভাপতি উত্তম কর্মকার বলেছেন, ‘এই মন্দিরে দুই দশকের বেশি সময় ধরে পূজা হচ্ছে। পাশে মসজিদ হওয়ার পর ভেবেছিলাম, কোনো সমস্যা হবে কি না। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি। আজানের সময় আমরা মাইকের শব্দ বন্ধ রাখি। পূজার সময়ও পারস্পরিক বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা হয়। মুসলমান ভাইদের সঙ্গে আমাদের কখনো দ্বন্দ্ব হয়নি।’
সম্প্রীতির এই বন্ধনের আরেকটি দিক উঠে আসে মসজিদ কমিটির সভাপতি মো. মুশফিকুর রহমানের কথায়। মন্দিরের সভাপতি অপুকে নিজের বন্ধু হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, ‘আমি মসজিদের সভাপতি, আর আমার বন্ধু অপু মন্দিরের সভাপতি। আমরা ভিন্ন ধর্মের মানুষ হলেও একসঙ্গে আড্ডা দিই। একে অপরের দাওয়াতে যাই। ঈদে তারা আমাদের বাড়িতে আসে, পূজায় আমরাও যাই। দিন শেষে আমরা সবাই একই গ্রামের মানুষ। এটাই আমাদের বড় পরিচয়।’
পশ্চিম ঝিকরার এই সম্পর্ক শুধু ব্যক্তিগত বন্ধুত্বে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্মীয় উৎসবেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। দুর্গাপূজার সময় মুসলিম যুবকেরা মন্দিরের নিরাপত্তায় সহযোগিতা করেন। ঈদের সময় হিন্দু যুবকেরাও মসজিদসংলগ্ন এলাকায় শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা করেন। আনন্দ ভাগাভাগি আর প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই শক্ত হয়েছে এই বন্ধন।
স্থানীয়দের কাছে তাই মসজিদ ও মন্দিরের পাশাপাশি অবস্থান কেবল দুটি উপাসনালয়ের সহাবস্থান নয়। এটি পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানের প্রতীক। মতপার্থক্য কিংবা ধর্মীয় পরিচয় যে মানুষের সম্পর্কের বাধা হতে পারে না, পশ্চিম ঝিকরার বাসিন্দারা প্রতিদিনের আচরণে সেই বার্তাই দিচ্ছেন।
চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল ফেরদৌস বলেছেন, ‘পশ্চিম ঝিকরার এই চিত্র সারা বাংলাদেশের জন্য একটি উদাহরণ। উৎসব সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আরও সুন্দর হয়ে ওঠে। এখানকার মানুষ তা প্রমাণ করেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই সম্প্রীতি অটুট রাখতে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।’
গ্রামের প্রবীণদের ভাষ্য, নানা সময়ে রাজনৈতিক বিভেদ সমাজে দূরত্ব তৈরি করলেও পশ্চিম ঝিকরায় ধর্ম কখনো মানুষের মধ্যে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়নি। এখানে এক সম্প্রদায়ের আনন্দে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও শামিল হন। বিপদে-আপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ান।
পশ্চিম ঝিকরার এই দৃশ্য তাই কেবল একটি গ্রামের গল্প নয়। এটি সহাবস্থান, সহনশীলতা ও মানবিক সম্পর্কের এক জীবন্ত উদাহরণ। একই আঙিনায় আজান আর শঙ্খধ্বনি মিলেমিশে সেখানে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়- ধর্ম যার যার, কিন্তু সম্প্রীতি সবার।




