গ্যাস সংকটে বন্ধ কারখানা, পচছে শত শত কোটির কাপড়

সংগৃহীত ছবি
তীব্র গ্যাস সংকটে কলকারখানা বন্ধ থাকায় এমনিতেই লোকসানের বোঝা টানছেন ব্যবসায়ীরা। এরই মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে উপকরণে পচন। উৎপাদন বন্ধ থাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ভেতরেই পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কাপড়, তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন উপকরণ। এতেই লোকসান ও দুর্ভোগ দ্বিগুণ হয়ে গেছে শিল্পকারখানার নগরী হিসেবে পরিচিত নরসিংদীর শিল্পমালিকদের।
ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং কারখানাগুলোয় পচে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার কাপড়। গত এক মাসে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। গতকাল বুধবার সকালে নরসিংদীর মাধবদীতে গিয়ে দেখা যায় ভয়াবহ চিত্র। উপজেলার তিথি টেক্সটাইল মিলসের ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং সেকশনে দেখা যায়, আড়াই লাখ গজ কাপড় মেশিনের ভেতর পানি এবং কেমিক্যালের সংমিশ্রণে নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে। এমন চিত্র জেলার প্রায় প্রতিটি ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং কারখানায়। তিন দিন আগে উৎপাদন চলমান অবস্থায় গ্যাসের চাপ কমে গেলে বন্ধ হয়ে যায় মেশিনগুলো। আর কাপড়গুলো পড়ে আছে ওই অবস্থায়। মেশিনে থাকা কাপড় এর মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে।
জানা যায়, গ্যাসের হাহাকারে নরসিংদীতে ব্যবসায়ীদের দুরবস্থা যেন কোনোভাবেই কাটছে না। গ্যাস সংকটে কলকারখানাগুলো বন্ধ থাকায় নানামুখী ক্ষতির মুখে ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে জেলার ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং কারখানাগুলোয় শাড়ি, থ্রি-পিস, গজ কাপড়, বেডশিটের কাপড়গুলো পচে নষ্ট হচ্ছে। পানিতে ভেজানো উৎপাদনের জন্য কেমিক্যাল দিয়ে প্রসেসিং করা গ্রে কাপড়ও ফ্লোরে পচে নষ্ট হচ্ছে। ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ।
কারখানার কারিগরদের দাবি, কেমিক্যাল দিয়ে গ্রে কাপড় প্রসেসিং করলে ১৬ ঘণ্টার মধ্যেই প্রক্রিয়া শেষ করতে হয়। কোনো কোনো কারখানায় তিন থেকে চার দিন ধরে গ্যাসের চাপ শূন্য পিএসআই থাকায় মেশিনগুলো একেবারেই বন্ধ। এ কারণে কেমিক্যাল দিয়ে ভেজানো কোটি কোটি টাকার কাপড় পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বাজারে, বাড়ছে কাপড়ের দাম। অন্যদিকে রপ্তানি আদেশ বাতিল হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
তিথি টেক্সটাইল মিলের ডিজিএম গিয়াসউদ্দিন জানালেন, তিন দিন ধরে আমাদের মিলের চাকা ঘুরছে না। আর গত এক মাস তো অল্প অল্প করে কারখানা চালানো গিয়েছিল। তিন দিন আগে একেবারেই গ্যাসের সংযোগ চলে যায়। বয়লার চালু করা যাচ্ছে না। ফলে মিশনগুলো বন্ধ। আমাদের প্রায় আড়াই লাখ গজ ভেজা কাপড় কেমিক্যালসহ পড়ে আছে, সব পচে যাচ্ছে। কাপড়গুলো আর ব্যবহার উপযোগী থাকবে না। এর মধ্যে ক্রেতারা আমাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। প্রতিটি কাপড়ে দিতে হবে জরিমানা। আমাদের এক্সপোর্টও বন্ধ।
এদিকে তিথি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রণব কুমার শাহার আকুতি, ‘কী করব বুঝতে পারছি না। একদিকে ব্যাংকের দেনা, অন্যদিকে শ্রমিকদের চরম অসন্তোষ। শ্রমিকরা কাজ করতে পারছে না; কিন্তু বেতন চাচ্ছেন। আমরা কাপড় উৎপাদন ও বিক্রি করতে না পারলে শ্রমিকের বেতন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল এবং ব্যাংকের টাকা কীভাবে দেব। সরকার আমাদের ব্যাপারে একটু চিন্তাভাবনা করুক। আর না হলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গুটিয়ে রাখতে হবে। আমরা চাই, সরকার যেন দ্রুত গ্যাস সমস্যার সমাধান করে।’
বাংলাদেশ টেক্সটাইল ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি মোমেন মোল্লা বললেন, নরসিংদীতে ছোট-বড় মিলিয়ে দুই শতাধিক ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং কারখানা রয়েছে। প্রতিটিতে ২ লাখ থেকে ৫ লাখ গজ কাপড় এর মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। কাপড়গুলোয় পানি এবং কেমিক্যাল মেশানো। তার একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ সময় থাকে প্রসেসিং করার। দিনের পর দিন যদি গ্যাস না থাকে, তাহলে এগুলো কাপড় নষ্ট তো হবেই— শুধু ডাইং খাতে এ মুহূর্তে আমাদের প্রায় ১০০ কোটি টাকার ওপরে ক্ষতি।
শুধু গত এক মাসে নরসিংদী ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং কারখানাগুলোয় এক কোটি গজ কাপড় পচে নষ্ট হচ্ছে, যার আনুমানিক মূল্য শতকোটি টাকা। নরসিংদী তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের ব্যবস্থাপক মাকসুদুর রহমানের ভাষ্য, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া সার কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২০০ প্রেশারে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। সার কারখানায় দেওয়ার পর বাকি থাকলে গ্যাস সিএনজি স্টেশন, কলকারখানা ও বাসাবাড়িতে সরবরাহ করা হয়। এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে দুই শতাধিক ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠান থাকলেও দেওয়া যাচ্ছে না প্রয়োজনীয় গ্যাস।






