ফ্রুট ব্যাগে আম, বদলে যাওয়ার নাম ময়েনউদ্দীন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রতিটি আম যেন একেকটি যত্নের গল্প। মুকুল ফোটা থেকে পাকা আম কুড়ানো—পুরো সময়জুড়েই চলে নিবিড় পরিচর্যা। মমতায় আগলে রাখা আমের যত্নে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। আর তাতেই চাঁপাইনবাবগঞ্জে উৎপাদন হচ্ছে নিরাপদ আম। স্বাদের পাশাপাশি সমান গুরুত্ব পাচ্ছে ভোক্তার আস্থা ও স্বাস্থ্যনিরাপত্তা।
একসময় অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ে যে উদ্বেগ ছিল, তা এখন ধীরে ধীরে কাটছে। কৃষকের উদ্যোগের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তায় মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে ইতিবাচক পরিবর্তন। বাড়ছে আস্থা, তৈরি হচ্ছে নতুন বাজারের সম্ভাবনা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুরের সোবহাননগর এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায় সেই পরিবর্তনের বাস্তব চিত্র। এখানকার কৃষকেরা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন ও পরিকল্পিতভাবে আম চাষ করছেন।
এই এলাকার আমচাষি মো. ময়েনউদ্দীন, যিনি গত ৭-৮ বছর ধরে নিরাপদ আম উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত, তার বাগান যেন এই পরিবর্তনের জীবন্ত উদাহরণ। মুকুল আসা থেকে শুরু করে পরিপক্বতা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে তিনি নেন বিশেষ যত্ন। আম যখন পূর্ণতা পায়, তখনই ব্যবহার করেন ‘ফ্রুট ব্যাগিং’ পদ্ধতি। বিশেষ করে রূপালি জাতের আমে ব্যাগ লাগানো হয়।
সোবহাননগরের বাগানে গত বুধবার কথা হয় ময়েনউদ্দীনের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘আগে একটি আমের জন্য ৬-৭ বার স্প্রে করতে হতো। কিন্তু এখন ফ্রুট ব্যাগ ব্যবহারের ফলে সেই প্রয়োজন পড়ে না। এতে আমে কোনো বিষক্রিয়া থাকে না। পাশাপাশি সোনালি মাছি পোকার আক্রমণসহ বিভিন্ন জীবাণু থেকেও সুরক্ষিত থাকে আম।’
ফ্রুট ব্যাগ ব্যবহারের ফলে আমে অ্যানথ্রাকনোজ রোগের ঝুঁকিও কমে আসে বলে জানান তিনি। এ ছাড়া ঝড়-বৃষ্টি কিংবা আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব থেকেও সুরক্ষিত থাকে আম। সব ধাপ পেরিয়ে যখন আম সংগ্রহ করা হয়, তখন এর রং, স্বাদ ও গুণগত মান সাধারণ আমের তুলনায় ভিন্নমাত্রা পায়।অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই পদ্ধতি লাভজনক। একটি ফ্রুট ব্যাগের দাম ৪ থেকে সাড়ে ৪ টাকা এবং শ্রম খরচ প্রায় ১ টাকা। মোট খরচ পড়ে প্রায় ৫ টাকা। তবে একটি ব্যাগ ২-৩ বার ব্যবহার করা যায়। বাজারে এসব নিরাপদ আমের চাহিদা বেশি, দামও তুলনামূলক বেশি। স্থানীয় বাজারেই প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়। আর সাধারণ পদ্ধতিতে উৎপাদিত আম বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকা দরে।
ময়েনউদ্দীন জানান, এক বিঘা জমিতে আম চাষে প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যয় হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে গড়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাভ থাকে।
অন্যদিকে, ৮ বিঘা জমিতে কাজ করতে প্রায় ১৫ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, যা স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করছে।
শুধু ময়েনউদ্দীন নন, রহনপুরের সোবহাননগরের আরও অনেক আমচাষির সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা সবাই ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিতে আম চাষ করে তাদের ভাগ্য বদলেছেন। তাদের এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে সাস্টেইনেবল মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশন এসএমএআরটি প্রকল্প। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর সহায়তায় কৃষক ও উদ্যোক্তাদের দেওয়া হচ্ছে উত্তম কৃষি চর্চার প্রশিক্ষণ। সম্পদ-সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন উৎপাদন পদ্ধতিও রয়েছে এই প্রশিক্ষণে। ফলে কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার, পরিমিত সার প্রয়োগ এবং স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।আমের এলাকা থেকে রাজধানীতে ফিরে কথা হয় পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ফজলুল কাদেরের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘সাধারণ মানুষের মধ্যেও এখন বিষমুক্ত খাবারের প্রতি ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। মানুষ নিরাপদ খাদ্য খেতে চায়, তবে এর জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতা।’
শুধু নিরাপদ উৎপাদন করলেই হবে না, সেটি প্রমাণ করার জন্য নির্ভরযোগ্য সার্টিফিকেশনও প্রয়োজন বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, ‘কোন বাগানে, কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় আম উৎপাদন হয়েছে—সেই তথ্য যেন সহজেই জানা যায়। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এখন সময়ের দাবি। আমরা কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, যাতে তারা আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন করতে পারেন। এতে শুধু দেশের বাজার নয়, রপ্তানির ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।’রাসায়নিক নির্ভরতা কমাতে নতুন ধারণা নিয়েও কাজ করছে পিকেএসএফের স্মার্ট প্রকল্প। তারা কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব ‘পেস্ট রিপেলেন্ট’ বা কীটবিতাড়ক পদ্ধতি নিয়েও এগোচ্ছে। এর গন্ধে ক্ষতিকর পোকামাকড় দূরে সরে যায়। আবার ফেরোমন ট্র্যাপ ব্যবহার করে পুরুষ পোকাগুলোকে আকৃষ্ট করে ফাঁদে ফেলা হয়, ফলে বংশবিস্তার কমে আসে। এতে বাগান সুরক্ষিত থাকে এবং একটি ভালো চর্চার উদাহরণ তৈরি হয়।
বাজারে নিরাপদ আমের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভ্রান্তির ঝুঁকিও রয়েছে। অনেকেই দাবি করেন, তারাও নিরাপদ আম উৎপাদন করছেন। এই বিভ্রান্তি ঠেকাতেও স্মার্ট প্রকল্প কাজ করছে। ভবিষ্যতে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ভোক্তাদের হাতে এমন একটি টুল দেওয়া যায়, যার মাধ্যমে তারা সহজেই বুঝতে পারবেন কোন আম সত্যিই নিরাপদ আর কোনটি নয়।
পিকেএসএফের এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে, ভোক্তার আস্থা আরও দৃঢ় হবে এবং নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হবে। এসব চর্চা নিশ্চিত করা গেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। এতে রপ্তানি বাড়বে, আর কৃষকেরাও পাবেন ন্যায্য মূল্য। এমনটাই মনে করছেন পিকেএসএফের কর্মকর্তারা। তাদের মতে, ইতোমধ্যেই বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ক্রেতাদের মধ্যে নিরাপদ আমের প্রতি আস্থা বাড়ছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে ক্রেতারা কিছুটা বেশি দাম দিয়েও এই আম কিনতে আগ্রহী।








