যুবককে বেঁধে নির্যাতন
বাঁচার জন্য কাঁদছিল তুষার, ভিডিও করতে ব্যস্ত ছিল মানুষ

সংগৃহীত ছবি
গাছের সঙ্গে বাঁধা এক যুবক। শরীরজুড়ে আতঙ্ক, চোখে অসহায়ত্ব। চারপাশে দাঁড়িয়ে কয়েকজন মানুষ— কারও হাতে বাঁশ, কারও হাতে মোটা লাঠি। মুহূর্তের মধ্যেই শুরু হয় এলোপাতাড়ি আঘাত। একটার পর একটা বাঁশ ভেঙে যাচ্ছে তার শরীরে। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানুষটি বুকফাটা কণ্ঠে চিৎকার করে উঠছে— ‘ওরে মা… মা গো…’, ‘ভাই, আর মারিস না…।’
কিন্তু তার সেই আর্তনাদ যেন পৌঁছায়নি কারও কানে। বরং কেউ কেউ দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য ভিডিও করেছে, কেউ দেখেছে নির্লিপ্ত চোখে, আর কেউ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে বিচার করার দায়িত্ব।
গতকাল রবিবার রাজশাহী মহানগরীর কাজলা এলাকার এই ঘটনাটি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল। কয়েক মিনিটের সেই ভিডিও যেন পুরো সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে। নির্যাতনের শিকার যুবকের নাম তুষার (২৫)। তিনি মতিহার থানার কাজলা এলাকার নাজিরের ছেলে।
নির্যাতনের এই ঘটনায় তুষারের বাবা নাজির হোসেন অভিযুক্ত তিনজনকে আসামি করে থানায় মামলা করেছেন। সোমবার সকালে করা সেই মামলায় ইতোমধ্যে অভিযুক্ত দুই যুবক নূর আহম্মেদ হৃদয় (৩০) ও তার চাচাতো ভাই মুজাহিদ ওরফে মুহিনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
দুপুরে তাদের গ্রেপ্তার করে থানা হেফাজতে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মতিহার থানার ওসি গোলাম কবির।
স্থানীয় সূত্র বলছে, নগরীর কাজলার কড়ইতলা এলাকার মো. শামীম হোসেনের বাসায় গত বৃহস্পতিবার চারটি ও গত শনিবার দুটি জানালার গ্রিল চুরি হয়। চুরির অভিযোগে তুষারকে হৃদয় ও তার বন্ধু আশিক রবিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাড়িতে ডেকে আনে। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে না দিয়ে বাড়ির আঙ্গিনার একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে শুরু করে নির্যাতন।
ভিডিওতে দেখা যায়, তুষারের শরীরে বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হচ্ছে। কখনও বাঁশ দিয়ে, কখনও মোটা লাঠি দিয়ে। একটি বাঁশ ভেঙে গেলে পাশ থেকে আরেকটি এনে আবার শুরু হচ্ছে মারধর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছিল আঘাতের তীব্রতা।
কাঁদতে কাঁদতে তুষার বারবার একজনের নাম ধরে ডাকছিলেন—‘হৃদয় ভাইয়া…’। ভিডিও ধারণ করা সেই যুবকের দিকেই অসহায়ের মতো তাকিয়ে তিনি করুণা চাইছিলেন। কাঁপা কণ্ঠে বলছিলেন, ‘ভাইরে, আর মারিস না… ছেড়ে দে…।’ তার সেই আকুতি যেন চারপাশের কোলাহলের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছিল।
এক পর্যায়ে অসহ্য যন্ত্রণায় তুষার মাটির দিকে লুটিয়ে পড়েন। শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছিল, কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল কান্নায়। তবুও থামেনি নির্যাতন। কয়েক মিনিট ধরে চলতে থাকে সেই নির্যাতন।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ ও উদ্বেগ। সচেতন মহলের প্রশ্ন— কোনো ব্যক্তি অপরাধী কি না, সেটি নির্ধারণ করার দায়িত্ব আদালতের কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ছোট-বড় নানা ঘটনায় জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। তুষারকে গাছে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনাটিও সেই ভয়ংকর বাস্তবতার আরেকটি উদাহরণ।
সোমবার বিকেলে সরেজমিনে তুষারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, নিজের ছোট্ট খুপড়ি ঘরে কষ্টে বসে আছেন। প্রতিবেদকের উপস্থিতি টের পেয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাইরে এসে বর্ণনা দেন সেই বিভীষিকাময় ঘটনার।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তুষার বলেছেন, ‘আমার কোনো দোষ ছিল না। হৃদয়ের শ্যালক রাব্বি শনিবার আমাকে ফোন করে জানালার দুটি গ্রিল বিক্রি করতে বলে। পরে আমি তার সঙ্গে গিয়ে কাজলা বাজারের একটি ভাঙারির দোকানে ৩২০ টাকায় গ্রিল দুটি বিক্রি করি। এরপর তারা আমাকে বাড়িতে ধরে নিয়ে মারধর করে গুরুতর আহত করে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আটকে রেখে নির্যাতন চালায়।’
নিজের পকেট থেকে ওষুধ বের করে দেখিয়ে তিনি বলেছেন, ‘সন্ধ্যার পর ছাড়া পেয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যাই। পরে তিন নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিয়ে আজ সকালে বাড়ি ফিরেছি। তারা আমার দুই পা ও হাত পিটিয়ে থেঁতলে দিয়েছে। এখন বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছি।’
যদিও রামেক হাসপাতালের ইনচার্জ শংকর কুমার বিশ্বাস জানিয়েছেন, ‘তুষার নামে কোনো রোগী ভর্তি হয়েছিল কি না বা চিকিৎসা নিয়েছে কি না, সে তথ্য আমাদের কাছে নেই।’
তুষারের বাবা নাজির হোসেনের ভাষ্য, ‘আমার ছেলে অন্যায় করলে পুলিশের হাতে তুলে দিতে পারত। কিন্তু তা না করে হৃদয়, তার চাচাতো ভাই মুহিন, বন্ধু আশিক ও মাহিন যেভাবে গাছে বেঁধে পিটিয়েছে এবং ভিডিও করে ফেসবুকে ছড়িয়েছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে।’
এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তুষারের বাবা।
বিকেলে প্রধান অভিযুক্ত হৃদয়ের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ছিলেন শুধু তার স্ত্রী মোহনা খাতুন। তখনও তিনি জানতেন না, পুলিশ তার স্বামীকে গ্রেপ্তার করেছে। হৃদয়ের অবস্থান জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, ‘কাজে গেছে।’
মতিহার থানার ওসি গোলাম কবির মন্তব্য করেন, ‘যদি তুষার কোনো অপরাধ করে থাকে, তাহলে তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করা যেত। কিন্তু গাছে বেঁধে নির্যাতন করে ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত অমানবিক কাজ।’
তিনি জানান, এ ঘটনায় করা মামলায় ইতোমধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।




