হারিয়ে যাচ্ছে রাখাইন ঐতিহ্য

বার্মাটিক কাঠে তৈরি ঐতিহ্যবাহী কাঠের বাড়ি। কাঠের খুঁটি, দরজা-জানালা ও কারুকার্যে এসব বাড়িতে যেন ধরে রাখা হয়েছে একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পূর্বপুরুষের স্মৃতি।
সবুজ পাহাড়, প্রাচীন বৌদ্ধবিহার আর নানা জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ কক্সবাজারের রামু। এই জনপদে এখনো টিকে রয়েছে রাখাইন সম্প্রদায়ের অতীত জীবনযাত্রার কিছু বিরল নিদর্শন। এর মধ্যে অন্যতম বার্মাটিক কাঠে তৈরি ঐতিহ্যবাহী কাঠের বাড়ি।
কাঠের খুঁটি, দরজা-জানালা ও কারুকার্যে এসব বাড়িতে যেন ধরে রাখা হয়েছে একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পূর্বপুরুষের স্মৃতি। তবে আধুনিকতার চাপে রামুর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা এসব কাঠের বাড়ি হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুত।
রামুর ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের হাইটুপি গ্রামে এখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে শতবর্ষী একটি কাঠের বাড়ি। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘দারোগাবাড়ি’ নামে পরিচিত। দীর্ঘ সময়ের সাক্ষী এ বাড়িতে এখনো বসবাস করছেন এক বৃদ্ধা। ছেলেমেয়েরা দেশের বাইরে থাকলেও পূর্বপুরুষের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি ছেড়ে যেতে রাজি নন তিনি।
তার কাছে এটি শুধু বসতঘর নয়; বংশের শিকড় ও পরিচয়ের অংশ। রাখাইন সম্প্রদায়ের প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব কাঠের বাড়ি নির্মাণের পেছনে রয়েছে বংশপরম্পরায় চলে আসা লোকজ জ্ঞান ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নির্মাণকৌশল। কাঠ সংগ্রহ থেকে শুরু করে সংরক্ষণ পর্যন্ত ছিল নিজস্ব পদ্ধতি।
রাখাইন সম্প্রদায়ের সদস্য মংচিংহ্লা চাক বললেন, শুষ্ক মৌসুমে বিশেষ করে কাঠ সংগ্রহ করা হতো শীতকালে। গাছ কাটার পর কাঠ পানিতে ভিজিয়ে রাখার প্রচলন ছিল ৭ থেকে ১০ দিন। এতে কাঠের স্থায়িত্ব বাড়ে বলে তাদের বিশ্বাস।
এসব ঘরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, মাটিতে সরাসরি কাঠ বসানো হয় না। উঁচু কাঠের খুঁটি বা মাচার ওপর ঘর তৈরি করা হয়। এতে মাটির স্যাঁতসেঁতে ভাব কাঠে পৌঁছাতে পারে না। ঘরের নিচ দিয়ে বাতাস চলাচল করায় কাঠ পচে যাওয়ার ঝুঁকিও কমে। ছাদের ঢালও রাখা হয় খাড়া, যাতে বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যায়।
রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের সাধারণ সম্পাদক রাজু বড়ুয়া বললেন, ‘রামুর বিভিন্ন এলাকায় একসময় অসংখ্য রাখাইন কাঠের বাড়ি ছিল। সময়ের সঙ্গে অনেক বাড়ি নষ্ট হয়ে েগছে। আবার আধুনিক জীবনযাত্রার কারণে অনেক পরিবার পুরনো ঘর ভেঙে পাকা ভবন করেছে।’
স্থানীয় ইতিহাসবিদ শিরুপন বড়ুয়া বললেন, এসব কাঠের ঘর শুধু বসতবাড়ি নয়, ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। এগুলো সংরক্ষণ করা না গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহ্য থেকে বঞ্চিত হবে।
রামু উপজেলার ইউএনও মো. জিল্লুর রহমান জানালেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য তুলে ধরতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। রাখাইন সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে আবেদন করা হলে প্রশাসন সহযোগিতা করবে।








