জমিদারি অতীত, চার শতকের ‘দেবালয়’ একাই আগলে রেখেছেন গৌরী

জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার খলিশাগাড়ির ঐতিহাসিক ‘দেবালয়’ জমিদারবাড়ি। ছবি: আগামীর সময়
জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে বহু আগে। কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে জমিদারদের প্রতাপ ও ঐশ্বর্য। তবে জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলায় চার শতক ধরে অমলিন রাজকীয় ঐতিহ্যের দুর্গাপূজা। উপজেলার খলিশাগাড়ির ঐতিহাসিক ‘দেবালয়’ জমিদারবাড়ি এবং বকসীপাড়ার জমিদার গিরীশ চন্দ্র চাকীর বাড়িতে আজও প্রতিমা গড়ে পূজার অর্ঘ্য দেওয়া হয়। তবে দেবালয়ের এই চার শতকের ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্য এখন একাই সামলাচ্ছেন বংশের প্রবীণ বধূ গৌরী রানী দেব।
স্থানীয় ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রায় ৪০০ বছর আগে খলিশাগাড়ি স্টেটের তৎকালীন জমিদার কৃষ্ণ কান্ত দেব নিজ বাড়িতে পূজার গোড়াপত্তন করেন। পরে তার ছেলে নীল মাধব দেব এবং দুই নাতি ইন্দু মাধব ও সুধাংশু মাধব দেবের হাত ধরে পূজার আয়োজন আরও বিস্তৃত হয়। নীল মাধবের নামানুসারেই বাড়িটি পরিচিতি পায় ‘দেবালয়’ নামে। নীল মাধব দেবের নাতবউ নিঃসন্তান গৌরী রানী দেব বর্তমানে এ বাড়িতে একাই বাস করছেন। বংশের ঐতিহ্য ধরে রাখতে সম্প্রতি তিনি নিজ উদ্যোগে ১১৮ বছর পর ঐতিহাসিক মন্দিরটি সংস্কার করিয়েছেন।
গৌরী রানী দেব বললেন, ‘পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া এই আয়োজন শুধুই পূজা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের চার শতকের ইতিহাস ও স্মৃতি। আমি জীবিত থাকা পর্যন্ত এই আলো জ্বলবেই।’
সাধারণত ষষ্ঠী থেকে দুর্গোৎসবের মূল ধুমধাম শুরু হলেও এই দুই জমিদারবাড়ির বিশেষত্ব হলো— মহালয়ার পর প্রতিপদ থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত টানা ১০ দিন ধরে পূজার আনুষ্ঠানিকতা চলে।
একই এলাকার বকসীপাড়ার জমিদার গিরীশ চন্দ্র চাকীর বাড়িতে প্রায় আড়াই থেকে তিন শতক ধরে পূজার আয়োজন চলছে। গিরীশ চন্দ্র চাকীর পৌত্র কিশোর কুমার চাকী (রতন চাকী) জানান, তার পিতামহের অধীনে প্রায় ২ হাজার ৯০০ বিঘা জমি ছিল। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের পর জমি প্রজাদের নামে খতিয়ানভুক্ত হলেও পূজার আনুষ্ঠানিকতায় কোনো ছেদ পড়েনি। বিশেষ করে পূজামণ্ডপে একসঙ্গে ২০টিরও বেশি ঢাকের বাদ্য বাজানোর বিশেষ ঐতিহ্য এখনো ধরে রেখেছেন তারা।
জমিদারি আমলে বিজয়া দশমীতে দেবালয়ের সামনে যে আনন্দমেলার সূচনা হয়েছিল, তা চারশ বছর পর আজও টিকে আছে। বিজয়া দশমীতে খলিশাগাড়িতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংলগ্ন স্থানে মেলা বসে, যা রূপ নেয় সর্বজনীন মিলনমেলায়।
উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি স্বপন কুমার রায় জানান, এবার ক্ষেতলালে ৪২টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এই দুই জমিদারবাড়ির পূজা এখনও পুরো উপজেলার অনন্য আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে।




