নোয়াখালীর হাতিয়া
কাগজে বন বাস্তবে ধু ধু বালুচর
- ১০০ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বন তৈরি করেছে বন বিভাগ। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ বাস্তবে নেই অস্তিত্ব
- কয়েকজন শ্রমিক দিয়ে বালুময় ৫-৬ কানি জমিতে রোপণ করা হয়েছিল চারা জোয়ার-ভাটায় ভেসে যায় সেগুলো

নোয়াখালীর হাতিয়ার উপকূলীয় এলাকায় ১০০ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বন তৈরি করেছে বন বিভাগ। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কাগজে-কলমে যে বন দেখানো হয়েছে, বাস্তবে নেই তার অস্তিত্ব। যে পরিমাণ বনায়নের কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে তার খুব সামান্য অংশও যায় না দেখা।
বন বিভাগের তথ্য বলছে, বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ‘হেল্প প্রকল্পের’ আওতায় উপকূল রক্ষায় নেওয়া হয় বনায়ন কর্মসূচি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হাতিয়ার চরআলীম (লালচর) এলাকায় ১০০ হেক্টর জমিতে তৈরি করা হয় ম্যানগ্রোভ বন।
জাহাজমারা রেঞ্জের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ১ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বন তৈরিতে সরকারিভাবে ব্যয় ধরা হয় ২১ থেকে ২৬ হাজার টাকা। সে হিসাবে বনায়নে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা। মূলত ভালোভাবে বন তৈরি করলে ১৫ হাজার টাকার বেশি লাগে না।
তবে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে ভিন্ন চিত্র। মৎস্যজীবী দেলোয়ার হোসেন বেচুর ভাষ্য, ‘অল্প কিছু শ্রমিক দিয়ে ৫-৬ কানি জায়গায় রোপণ করা হয়েছিল চারা। যেভাবে চারা লাগানো হয়েছে, তাতে সেগুলো টিকে থাকার সুযোগ ছিল না। এখন সেখানে নেই বনের কোনো চিহ্ন।’
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন দুলাল মাঝি, জয়নাল আবেদীন ও আউয়াল। তাদের দাবি, শীত মৌসুমের শুরুতে সীমিতসংখ্যক শ্রমিক দিয়ে অল্প এলাকায় রোপণ করা হয়েছিল কেওড়ার চারা।
লালচর এলাকায় গবাদি পশু চরাতে যাওয়া দুই কিশোর রাখাল রাকিব ও তার সঙ্গী জানিয়েছে, ৬০-৭০ জন শ্রমিক ৪-৫ কানি জমিতে কেওড়ার চারা লাগিয়েছিলেন। কিন্তু বালুময় স্থানে চারা রোপণ করায় জোয়ার-ভাটায় ভেসে যায় সেগুলো।
সাগুরিয়া রেঞ্জের নৌকাচালক আবুল হাসেমের ভাই কালু সর্দারসহ কয়েকজন শ্রমিকের মাধ্যমে পরিচালিত হয় চারা রোপণের কাজ। তবে আবুল হাসেম ও কালু সর্দার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ‘লালচরে করা হয়েছে বনায়ন। বন না টিকলে করার নেই কিছু।’
অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে
মোল্যা রেজাউল করিম
উপকূলীয় অঞ্চলের বন সংরক্ষক
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ১০০ হেক্টর এলাকায় ম্যানগ্রোভ বন তৈরিতে বিপুলসংখ্যক চারা ও কয়েকশ শ্রমিক প্রয়োজন হওয়ার কথা। অথচ স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, কাজ হয়েছে সীমিত অংশে।
অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বড় অংশ ব্যয় হয়নি যথাযথভাবে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের যোগসাজশ ছাড়া এমন অনিয়ম সম্ভব নয়। প্রকল্পের আর্থিক ব্যয়, চারা রোপণের প্রকৃত পরিমাণ এবং বেঁচে থাকা চারার সংখ্যা নিয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
সিনিয়র সাংবাদিক এম দিলদার উদ্দিনের মতে, উপকূল রক্ষার নামে কাগজে-কলমে বন দেখিয়ে অর্থ লুট করা শুধু দুর্নীতি নয়; এটি উপকূলবাসীর জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে প্রতারণা।
অভিযোগের বিষয়ে সাগুরিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের বক্তব্য, ‘সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী রোপণ করা হয়েছে নির্ধারিত পরিমাণ চারা।’
অবশ্য উপকূলীয় অঞ্চলের বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম জানিয়েছেন, তিনি দায়িত্ব পেয়েছেন সবেমাত্র। অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন এই কর্মকর্তা।
ম্যানগ্রোভ বন উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। ঝড় জলোচ্ছ্বাসের প্রতিরোধক এবং জেগে ওঠা চরাঞ্চলের মাটির ক্ষয়রোধে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ মহিনুজ্জামানের ভাষায়, শুধু বনায়ন করলে হবে না, এর রক্ষণাবেক্ষণও জরুরি। কাগজে-কলমে হাজার হাজার বন দেখালে হবে না, বাস্তবিকভাবেও থাকতে হবে। যেকোনো বনায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের দায়িত্বশীল টিমের সঠিক মনিটরিংও থাকা দরকার।
বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরে ওই বিভাগের অধ্যাপক ড. জয়ন্ত কুমার বসাকও করেন একই মন্তব্য।


