বন্দরের এনসিটি পেতে দেশি প্রতিষ্ঠানের দুই লোভনীয় প্রস্তাব

সংগৃহীত ছবি
আরব-আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড, দেশিয় প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপের পর এবার নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে নতুন দেশিয় কনসোর্টিয়াম। তিনটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়া এই কনসোর্টয়ামে সাইফ পাওয়ারটেকের নেতৃত্বে আছে সরকারি দল বিএনপির এমপির মালিকানাধীন দুই বার্থ অপারেটর প্রতিষ্ঠান।
তিনটি প্রস্তাবের মধ্যে কেবল ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রস্তাব নিয়েই সরকার এগোচ্ছে। অন্য প্রস্তাব বিবেচনার বিষয়ে পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া বললেন, ‘আমরা ডিপি ওয়ার্ডরে প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছি। মাঝপথে অন্য কোন প্রস্তাব বিবেচনার সুযোগ নেই।’
চট্টগ্রাম বন্দরের বার্ষিক রাজস্ব আয় ৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে দেড় হাজার কোটি টাকা একাই জোগান দেয় এনসিটি। বন্দরের হৃৎপিণ্ড হিসেবে পরিচিত এনসিটিতে মোট কনটেইনার ওঠা-নামা করে ৪৫ শতাংশ। সবচেয়ে বড় জাহাজও ভিড়ে এই টার্মিনালে। সবচেয়ে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকায় ৪৮ ঘণ্টায় জাহাজ থেকে দ্রুত পণ্য খালাস শেষ হয়।
সেই রেডিমেড টার্মিনাল পরিচালনা করতে প্রস্তাব দিচ্ছে একের পর এক দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান। এনসিটি নিয়ে প্রথম প্রস্তাব দেয় ডিপি ওয়ার্ল্ড। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই সেই প্রস্তাবে বাস্তবায়নে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসলে সেই প্রক্রিয়া এগিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির পর্যায়ে উন্নীত হয়। শ্রমিক আন্দোলনের মুখে বন্দর অচল হলে ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার সেই চুক্তির প্রক্রিয়া স্থগিত করতে বাধ্য হয়। বিএনপি সরকারের সময় নীরবে সেই প্রক্রিয়া এগোয়। ৪ জুন নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত দেয় ডিপি ওয়ার্ডের প্রস্তাব নিয়ে নেগোসিয়েশন এগিয়ে নিতে। সেই প্রক্রিয়া এখন চলমান।
এই ঢামাঢোলে আগেই ‘সাইফ-কসমস-এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস কনসোর্টিয়াম’ গত ২৮ এপ্রিল নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ে টার্মিনাল পরিচালনার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দেয়। কিন্তু সেটি প্রকাশ পায় ৮ জুন।
কনসোর্টিয়াম নেতৃত্বে থাকা সাইফ পাওয়ারটেক ২০০৬ সাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে আধুনিক দুটি টার্মিনাল এনসিটি, সিসিটি পরিচালনা করে আসছিল। ২০২৫ সালে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে এনসিটি পরিচালনা শুরু করে সরকারি চিটাগাং ড্রাইডক লিমিটেড। আর সিসিটি এখনো সাইফ পাওয়ারটেক পরিচালনা করছে।
কনসোর্টিয়ামে থাকা কসমস এন্টারপ্রাইজ ১৯৮৯ সাল থেকে বন্দরে স্টিভিডোরিং বা বর্তমানে বার্থ অপারেটর কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সেটির মালিক লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ও হুইপ এ বিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান।
আরেক অংশীদার এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস ১৯৮৮ সাল থেকে জেনারেল কার্গো বার্থের (জিসিবি) জেটি বা বার্থ অপারেটর হিসেবে পণ্য উঠা-নামায় নিয়োজিত। প্রতিষ্ঠানের মালিক লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম।
অন্যদের তুলনায় আপনাদের প্রস্তাব কীভাবে ব্যতিক্রম জানালেন সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন। বললেন ‘টার্মিনালের মালিকানা নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দরের হতেই থাকবে। ১৫ বছর ধরে জনবল, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং কন্টেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম পরিচালনা আমরাই করবো। কোনো ধরনের বিনিয়োগ না করেই বন্দর প্রতি কন্টেইনার ৯২ ডলার আয় করবে।’
বন্দর কর্তৃপক্ষের নিরীক্ষা প্রতিবেদন বলছে, প্রতি একক কনটেইনার পরিচালন থেকে বন্দর আয় করে ১৬১ দশমিক ৮২ ডলার, বিপরীতে ব্যয় ৫৬ দশমিক ১৫ ডলার। খরচ বাদ দিয়ে নিট আয় কন্টেইনার প্রতি ১০৫ দশমিক ৬৭ ডলার।
তাহলে ১০৫ ডলার নিট আয় বদলে কনসোর্টয়িামের প্রস্তাব কেন বিবেচনা করবে বন্দর। এমন প্রশ্নের উত্তরে তরফদার রুহুল আমিন বললেন, ‘আগামী ১৫ বছরে যন্ত্রপাতি সংযোজন, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালন করতে বন্দরের অন্তত ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। এই বিনিয়োগ থেকে বন্দর মুক্ত। আমরাই বন্দরের হয়ে সেটি বিনিয়োগ করবো।’
২৮ এপ্রিল একইদিন দেশিয় বহুজাতিক এমজিএইচ গ্রুপও এনসিটি পরিচালনার জন্য পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কাঠামোর ভিত্তিতে প্রস্তাব দেয়। প্রতি কনটেইনারে ডিপি ওয়ার্ল্ডের তুলনায় পাঁচ ডলার বেশি রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে তারা। ডিপি ওয়ার্ল্ডের ২০ মিলিয়ন ডলারের বিপরীতে এমজিএইচ ২৫ মিলিয়ন ডলার অগ্রিম ফি দেওয়ারও প্রস্তাব করেছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের ১.৫৪ বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে এমজিএইচ-এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের আয় হবে প্রায় ১.৬৮ বিলিয়ন ডলার।
এমজিএইচ-এর গ্রুপ ম্যানেজিং ডিরেক্টর আনিস আহমেদ বললেন, ‘প্রত্যেক স্তরেই আমরা বন্দরকে বেশি রেভিনিউ দেওয়ার প্রস্তাব করেছি। এতে দেশ ও বন্দর লাভবান হবে। আমরাও ব্যবসা পাব। টাকাও দেশে থাকবে। পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল বিদেশি দিয়ে চালিত, আজ পর্যন্ত তারা চট্টগ্রাম পোর্টের সাথে অঙ্গীকার করা ৫০ শতাংশ প্রডাক্টিভিটি ডেলিভার করতে পারেনি। তারপরও আরেক বিদেশি অপারেটরের সাথে আলাপ, আমাদেরকে বাদ দিয়ে?’
এমজিএইচ-এর নিজস্ব আইসিডি রয়েছে এবং ৭টি বিদেশি শিপিং লাইনের সাথে চুক্তি থাকায় প্রথম দিন থেকেই টার্মিনালে কনটেইনার প্রবাহ নিশ্চিত থাকবে। সম্পূর্ণ দেশি মালিকানাধীন হওয়ায় এর লভ্যাংশ দেশেই পুনর্বিনিয়োগ হবে এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে না।
ডিপি ওয়ার্ডকে পিপিপি ও সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) কাঠামোর আওতায় ১৫ বছরের জন্য পুরো টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এ ব্যবস্থায় টার্মিনাল পরিচালনা, মাশুল আদায় ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের দায়িত্ব থাকবে অপারেটরের হাতে। ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বমানের অপারেটর বিশ্বজুড়ে শিপিং কানেকটিভিটি আছে তাদের। বিনিময়ে বন্দর নির্ধারিত রাজস্ব পাবে। সেই রাজস্ব কত হবে সেটি এখন নির্ধারণের আলোচনা চলছে। নিয়ম অনুযায়ী ডিপি ওয়ার্ল্ড লভ্যাংশের পুরো টাকাই বিদেশে নিয়ে যাবে।




