বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক বিমানবন্দর!

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৯ হাজার ৩৮০ ফুট উপরে অবস্থিত এই বিমানবন্দরটির রানওয়ের দৈর্ঘ্য মাত্র ৫২৭ মিটার
হিমালয়ের বুক চিরে ছোট্ট একটি রানওয়ে। এক পাশে খাড়া পাহাড়ের দেয়াল, অন্য পাশে হাজার ফুট গভীর খাদ। ভুলের সুযোগ নেই একটুও। পাইলট যদি সামান্য হিসাবও ভুল করেন, তাহলে সামনে অপেক্ষা করছে ভয়ংকর পরিণতি। গল্পটি নেপালের লুকলা বিমানবন্দরের, আনুষ্ঠানিক নাম তেনজিং-হিলারি বিমানবন্দর। পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক বিমানবন্দরগুলোর তালিকায় এটি প্রায় সবসময়ই উপরের দিকে থাকে।
মাউন্ট এভারেস্টে ওঠার স্বপ্ন দেখা হাজারো মানুষের কাছে এটাই প্রবেশদ্বার। আবার অনেকের কাছে এটি দুঃস্বপ্নের অপর নাম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৯ হাজার ৩৮০ ফুট উপরে অবস্থিত এই বিমানবন্দরটির রানওয়ের দৈর্ঘ্য মাত্র ৫২৭ মিটার। বড় যাত্রীবাহী বিমান এখানে নামতেই পারে না। ছোট আকারের বিশেষ উড়োজাহাজ দিয়েই যাত্রী পরিবহন করা হয়। রানওয়েটি আবার সমতল নয়, ঢালু। যেন পাহাড়ের গায়ে জোর করে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে এক টুকরো কংক্রিটের রাস্তা। এই রানওয়ের এক প্রান্ত গিয়ে ঠেকেছে পাহাড়ের দেয়ালে। অন্য প্রান্ত শেষ হয়েছে গভীর খাদে। ফলে অবতরণের সময় পাইলটের সামনে থাকে পাহাড়, আর উড্ডয়নের সময় সামনে খুলে যায় শূন্যে ঝুলে থাকা ভয়ংকর গভীরতা।
এখানে দ্বিতীয়বার চেষ্টা করার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। অর্থাৎ অবতরণ শুরু করলে ফিরে যাওয়ার পথ খুব সীমিত। শুধু রানওয়েই নয়, লুকলাকে ভয়ংকর করে তুলেছে এখানকার আবহাওয়া। কয়েক মিনিট আগেও যেখানে আকাশ পরিষ্কার, হঠাৎ সেখানে নেমে আসতে পারে ঘন কুয়াশা। মেঘ ঢেকে ফেলতে পারে পুরো উপত্যকা। প্রবল বাতাসে দুলতে থাকে উড়োজাহাজ। পাহাড়ি অঞ্চলের অনিশ্চিত আবহাওয়ার কারণে এখানে প্রায়ই উড়োজাহাজ ওঠানামা বন্ধ থাকে। অনেক পর্যটক দিনের পর দিন অপেক্ষা করেন শুধু একটি উড়োজাহাজের জন্য। তবু প্রতিদিন মানুষ সেখানে যায়। কারণ এভারেস্টের পথে যাত্রা শুরু হয় এই লুকলা থেকেই।
অনেক পর্যটক বলেন, লুকলার পথে উড়োজাহাজে চড়ার সময় বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করে। ভয়, উত্তেজনা আর বিস্ময় সব মিলেমিশে যায় একসঙ্গে। জানালার বাইরে তখন দেখা যায় বরফে ঢাকা পাহাড়চূড়া, মেঘের সাদা সমুদ্র আর নিচে গভীর উপত্যকা। মনে হয় যেন পৃথিবীর একেবারে অন্য কোনো প্রান্তে চলে এসেছে মানুষ।
লুকলা বিমানবন্দরে অবতরণ করার অনুমতি পান না সব পাইলট। এখানে বিমান নামাতে হলে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক। নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী, পাইলটদের আগে স্বল্পদৈর্ঘ্য পাহাড়ি রানওয়েতে বহুবার উড্ডয়ন ও অবতরণের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। কারণ লুকলায় বিমান চালানো মানে পাহাড়, বাতাস আর মুহূর্তে বদলে যাওয়া আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করা। অনেক পাইলটই বলেছেন, লুকলায় সফলভাবে বিমান নামানো তাদের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি। মজার বিষয় হলো, বিমানবন্দরটিতে আধুনিক রাডারভিত্তিক নেভিগেশনও দীর্ঘদিন ছিল না। ফলে পাইলটদের অনেকাংশেই ভরসা করতে হতো নিজের চোখ, অভিজ্ঞতা আর পাহাড়ি পথ চিনে নেওয়ার দক্ষতার ওপর।
এই বিমানবন্দরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানব ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তি পর্বতারোহী এডমন্ড হিলারির নাম। ১৯৫৩ সালে শেরপা তেনজিং নোরগেকে সঙ্গে নিয়ে প্রথমবারের মতো পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট জয় করেছিলেন তিনি। পরে হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে বসবাসকারী শেরপা জনগোষ্ঠীর জন্য স্কুল, হাসপাতাল ও সেতু নির্মাণে বড় ভূমিকা রাখেন। লুকলা বিমানবন্দর নির্মাণেও তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। সেই কারণেই পরে বিমানবন্দরটির নাম রাখা হয় তেনজিং-হিলারি বিমানবন্দর। কিন্তু পাহাড় তাকে যেমন খ্যাতি দিয়েছে, তেমনি কেড়ে নিয়েছে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষদেরও।
১৯৭৫ সালের ৩১ মার্চ। ছোট একটি উড়োজাহাজ উড়েছিল কাঠমান্ডু থেকে। সেখানে ছিলেন এডমন্ড হিলারির স্ত্রী লুইস এবং তাদের কন্যা বেলিন্ডা। তারা যাচ্ছিলেন হিলারির একটি হাসপাতাল প্রকল্পে যোগ দিতে। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত হয় উড়োজাহাজটি। প্রাণ হারান সবাই। এই দুর্ঘটনা হিলারিকে গভীরভাবে ভেঙে দিয়েছিল। পরে তিনি নিজেই লিখেছিলেন, জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতা নেমে এসেছিল সেই দিনে।
লুকলা বিমানবন্দরের ইতিহাসে ঘটেছে আরও বহু দুর্ঘটনা। ২০০৮ সালে ঘন কুয়াশার মধ্যে অবতরণের সময় একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হন বহু মানুষ। ২০১৭ সালে রানওয়ের কাছাকাছি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি উড়োজাহাজ খাদে পড়ে যায়। ২০১৯ সালে উড্ডয়নের সময় একটি উড়োজাহাজ রানওয়ে থেকে ছিটকে গিয়ে পাশের একটি হেলিকপ্টারের ওপর আছড়ে পড়ে। এসব দুর্ঘটনার পরও লুকলার ব্যস্ততা কমেনি। কারণ ভয় আর সৌন্দর্য দুটো কখনো কখনো পাশাপাশি হাঁটে। অনেক পর্যটক বলেন, জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অথচ সুন্দর উড়োজাহাজ ভ্রমণ ছিল এটি। কেউ অবতরণের পর স্বস্তিতে হাততালি দেন। কেউ মাটিতে পা রেখেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। যেন মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এলেন।
সূত্র: এবিসি নিউজ, উইকিপিডিয়া, এনজেড হিস্ট্রি, ব্যুরো অব এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট আর্কাইভস, আউটসাইড









