জনমানবহীন দ্বীপটিতে যে কারণে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ

দূর থেকে দেখলে দ্বীপটিকে শান্তই মনে হয়। আটলান্টিক মহাসাগরের নীল জলের মাঝে সবুজে ঢাকা ছোট্ট এক ভূখণ্ড। ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে পাথুরে উপকূলে, বাতাসে দুলছে গাছের মাথা। কিন্তু ব্রাজিলের উপকূল থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার দূরের এই দ্বীপটি জেলেদের কাছে আতঙ্কের এক প্রতিশব্দ। কারণ তারা জানে, ওখানে ভুল করে পা রাখলে হয়তো আর ফিরে আসা যাবে না।
দ্বীপটির নাম ইলহা দা কুইমাদা গ্রান্দে। তবে বেশিরভাগ মানুষ একে চেনে অন্য নামে, 'স্নেক আইল্যান্ড' বা সাপের দ্বীপ।
স্থানীয়দের মধ্যে বহুদিন ধরে একটি গল্প প্রচলিত আছে। বলা হয়, এক জেলে নাকি একবার খাবারের খোঁজে দ্বীপে গিয়েছিল। পরে তার নৌকাটি ভাসতে দেখা যায় উপকূলে, কিন্তু মানুষটিকে পাওয়া যায়নি। আবার আরেক কাহিনিতে বলা হয়, দ্বীপের বাতিঘর রক্ষকের পুরো পরিবারকে এক রাতে জানালা বেয়ে ঢুকে পড়া সাপ কামড়ে মেরে ফেলেছিল। সত্য-মিথ্যা যাচাই করা কঠিন, কিন্তু এসব গল্পের পেছনে যে বাস্তব ভয় আছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
- কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে বিষধর সাপগুলোর একটি এই দ্বীপেই বাস করে।
গোল্ডেন ল্যান্স হেড পিট ভাইপার।
নামটি শুনতে সুন্দর লাগলেও বাস্তবতা ভয়ংকর। হলুদাভ-সোনালি শরীরের এই পিট ভাইপার প্রজাতির সাপের বিষ এতটাই শক্তিশালী যে তা খুব দ্রুত শরীরের টিস্যু গলিয়ে ফেলতে পারে। ব্রাজিলের গবেষকদের মতে, এই সাপের বিষ সাধারণ কিছু ভাইপার সাপের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি কার্যকর। কামড়ের পর মানুষের শরীরে তীব্র রক্তক্ষরণ, কিডনি বিকল হওয়া, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ এমনকি দ্রুত মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।
আর সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, এই সাপ শুধু একটি দ্বীপেই পাওয়া যায়। পৃথিবীর আর কোথাও নয়।
হাজার হাজার বছর আগে এই দ্বীপ ব্রাজিলের মূল ভূখণ্ডের অংশ ছিল। শেষ বরফ যুগের পর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে শুরু করলে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ছোট্ট এই পাহাড়ি ভূমি। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এখানকার প্রাণীরাও। গবেষকদের ধারণা, তখন কিছু পিট ভাইপার এই দ্বীপে আটকা পড়ে যায়।
সমস্যা হলো, দ্বীপটিতে বড় স্তন্যপায়ী প্রাণী ছিল না। অর্থাৎ শিকার কম। তাই টিকে থাকার জন্য সাপগুলোকে বদলে যেতে হয়। প্রকৃতি তাদের শরীর ও বিষকে আরও কার্যকর করে তোলে। ধীরে ধীরে জন্ম নেয় আলাদা এক উপপ্রজাতি— সোনালি ল্যান্সহেড।
বিজ্ঞানীরা বলেন, এটি বিবর্তনের এক অসাধারণ উদাহরণ। বিচ্ছিন্ন পরিবেশ কীভাবে প্রাণীদের দ্রুত বদলে দিতে পারে, এই দ্বীপ তার জীবন্ত প্রমাণ।
দ্বীপটিতে এখন প্রতি বর্গমিটারে একটি করে এ প্রজাতির সাপ আছে— এমন দাবি প্রায়ই শোনা যায়। যদিও গবেষকেরা বলেন, সংখ্যাটি অতিরঞ্জিত। তবু বাস্তবতাও কম ভয়ংকর নয়। বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, কয়েক হাজার গোল্ডেন পিট ভাইপার সাপ এখনো এই দ্বীপে বাস করে। ঘন ঝোপ, পাথুরে ঢাল আর গাছের ডালের ফাঁকে তারা লুকিয়ে থাকে।
এদের শিকারের ধরনও আলাদা।
মূল ভূখণ্ডের আত্মীয় সাপগুলো সাধারণত ইঁদুর বা ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী শিকার করে। কিন্তু এই দ্বীপে প্রধান খাবার পরিযায়ী পাখি। দীর্ঘ পথ উড়ে ক্লান্ত পাখিরা যখন দ্বীপে বিশ্রাম নিতে নামে, তখন গাছের ডালে অপেক্ষা করে থাকে সোনালি এই সাপেরা। দ্রুত আঘাত, বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া, তারপর কয়েক মিনিটের মধ্যে শিকার অচল।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পাখি যাতে উড়ে পালাতে না পারে, সে কারণেই এই সাপের বিষ এত দ্রুত কাজ করার মতো বিবর্তিত হয়েছে।
দ্বীপটিতে মানুষের প্রবেশ এখন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। ব্রাজিল সরকার সাধারণ পর্যটকদের সেখানে যাওয়া নিষিদ্ধ করেছে। শুধু নৌবাহিনী ও অনুমোদিত গবেষকেরা বিশেষ অনুমতি নিয়ে সেখানে যেতে পারেন। কারণ একটি ভুল পদক্ষেপই প্রাণঘাতী হতে পারে।
তবু মাঝে মাঝে কিছু দুঃসাহসী মানুষ অবৈধভাবে সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করে। কারণ কালোবাজারে এই সাপের মূল্য বিপুল। বিরল প্রজাতি হওয়ায় অবৈধ পাচারকারীরা একটি সাপের জন্য হাজার হাজার ডলার পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত। ফলে সাপের দ্বীপ শুধু প্রাকৃতিক বিস্ময় নয়, বন্যপ্রাণী পাচারেরও একটি অন্ধকার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ভয়ংকর সাপই হয়তো ভবিষ্যতে মানুষের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করবে।
গবেষণাগারে বিজ্ঞানীরা সোনালি এই সাপদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তাদের মতে, এই বিষে এমন কিছু রাসায়নিক উপাদান রয়েছে যা হৃদরোগের চিকিৎসা কিংবা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগতে পারে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বহু গুরুত্বপূর্ণ ওষুধই এসেছে প্রাণীর বিষ থেকে। তাই মৃত্যুর প্রতীক এই সাপ একদিন হয়তো জীবনের প্রতীকও হয়ে উঠতে পারে।
তবে দ্বীপটির ভবিষ্যৎ খুব নিরাপদ নয়।
একদিকে অবৈধ পাচার, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন— দুই দিক থেকেই হুমকিতে আছে এ পিট ভাইপারেরা। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, সমুদ্রের তাপমাত্রা ও পরিবেশ বদলে গেলে এই সাপের সংখ্যা দ্রুত কমে যেতে পারে। কারণ এরা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। অর্থাৎ এই ছোট্ট দ্বীপটিই তাদের পুরো পৃথিবী।
সাপের দ্বীপের দিকে তাকালে শুধু ভয় নয়, প্রকৃতির নির্মম সৌন্দর্যও চোখে পড়ে। এখানে জীবন ও মৃত্যু পাশাপাশি বাস করে। এখানে বিবর্তন চোখের সামনে নিজের গল্প লিখেছে। আর মানুষ, যে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণী ভাবে, সে এখনো এই ছোট্ট দ্বীপের সামনে অসহায়।
সমুদ্রের বুকের সেই সবুজ দ্বীপটি দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দে। ঢেউ আছড়ে পড়ছে পাথরে, বাতাস বইছে গাছের মাথায়। আর পাতার আড়ালে হয়তো ঠিক এই মুহূর্তেও কুণ্ডলী পাকিয়ে অপেক্ষা করছে একটি সোনালি ল্যান্সহেড— পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় ও ভয়ংকর দ্বীপের নিঃশব্দ প্রহরী।
সূত্র :
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন
ব্রাজিলিয়ান বুটানটান ইনস্টিটিউট
বিবিসি আর্থ
লাইভ সায়েন্স








