যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ছাড়াল ৪০ ট্রিলিয়ন, দশ বছরে দ্বিগুণ

মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের দফতর। ছবি : রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ এক দশকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ছিল ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের কিছু কম।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের (অর্থ মন্ত্রণালয়) দেওয়া সবশেষ পরিসংখ্যান থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সাবেক জো বাইডেনের প্রশাসনের সময়ে সরকারের ব্যাপক ব্যয় এই ঋণ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধের খরচও বেড়েছে।
কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস (সিবিও) ধারণা করেছিল, ২০২৬ অর্থবছরের শেষ নাগাদ সরকারের মোট ঋণ ৩৯ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
তবে প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত ঋণ বেড়েছে। এতে সরকারের ঋণের চাহিদা কত দ্রুত বাড়ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের খরচ কতটা বাড়বে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সিবিও বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ এখন ৪১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণসীমার কাছাকাছি। ২০৩৬ সালের মধ্যে দেশটির ঋণ প্রায় ৬৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মোট অর্থনীতির আকারের তুলনায় সরকারি ঋণের অনুপাত ১২৫ দশমিক ৮ শতাংশ। বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম সর্বোচ্চ।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার আরও বেশি ঋণ নেওয়ায় ভোক্তাদের ওপরও চাপ বেড়েছে। বেড়েছে সুদের হার ও মূল্যস্ফীতি।
১৮ আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৪০ দশমিক ০৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সরকারের সব বকেয়া বন্ড, বিল ও নোট রয়েছে। দুই প্রেসিডেন্টের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র কতটা ঋণ নিয়েছে, এই পরিমাণে তার চিত্রও ফুটে উঠেছে।
বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহে ব্যবহৃত ৩০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার মঙ্গলবার ৫ দশমিক ৩৪ শতাংশে উঠেছে। প্রায় ২০ বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ।
এই সুদের হারকে ‘ইল্ড’ বলা হয়। এটি সরকার, কোম্পানি ও ভোক্তাদের ঋণ নেওয়ার খরচকে প্রভাবিত করে। এর প্রভাব পড়ে গৃহঋণ, গাড়ির ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের খরচেও।
সাম্প্রতিক সময়ে বন্ডের ইল্ড বাড়ার পেছনে বড় কারণ তেলের দাম বৃদ্ধি। ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সরকারের ঋণ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের কোম্পানিগুলো বিপুল অর্থ ঋণ নিয়ে এ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে। তবে এসব বিনিয়োগ থেকে কত দ্রুত এবং কতটা লাভ আসবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
দীর্ঘমেয়াদি বন্ডে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এর লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদি বন্ডে ‘আরও বেশি তারল্য সহায়তা’ দেওয়া।
৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত বন্ড পুনঃক্রয়ের পরিমাণ অন্তত দ্বিগুণ করা হবে। ২০০ কোটি ডলার থেকে তা বেড়ে ৪০০ কোটি ডলার হবে।
এই ঘোষণার পর ৩০ বছর মেয়াদি ঋণের সুদের হার কমে ৫ দশমিক ১৮ শতাংশে নেমেছে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের প্রধান বিশ্লেষক জন ক্যানাভান বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি ঋণের খরচ কমাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তেলের দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি এবং বিশ্বজুড়ে সরকার ও কোম্পানিগুলোর বিপুল ঋণ নেওয়ার কারণে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের খরচের ওপর বড় চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ঋণের তুলনায় সরকারের বন্ড পুনঃক্রয় বাড়ানোর এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের স্বস্তি দিতে পারবে না।
জার্মানির ডেজেড ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক রেনে আলব্রেখট বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে ৫ শতাংশ বা তার বেশি ইল্ডের চাপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার উদ্বিগ্ন। কারণ এতে শুধু সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচই বাড়ে না। বেসরকারি খাতের খরচও বাড়ে।
আলব্রেখট বলেছেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন হতে আর মাত্র তিন মাস বাকি। সাম্প্রতিক সময়ে ইল্ড বেড়ে যাওয়ায় তা নিয়ন্ত্রণে আনতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে হাতে থাকা বিভিন্ন ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়েছে।’
অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এ এল-এরিয়ান অবশ্য বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি ঋণের খরচ কমানোর পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপের পেছনে আরও বড় একটি পরিকল্পনা থাকতে পারে। সেটি হলো সুদের হার নিয়ন্ত্রণে রাখা। অর্থনীতিতে একে ‘ইল্ড কার্ভ কন্ট্রোল’ বলা হয়।
তার মতে, এই পদক্ষেপে স্বল্প ও তাৎক্ষণিক সময়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ইল্ড কমতে পারে। এতে গৃহঋণসহ অন্যান্য ঋণের খরচও কমতে পারে। তবে এর ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতি ও পরিণতি’ হতে পারে।
এ তুলনায় যুক্তরাজ্য ও চীনের ঋণ-জিডিপি অনুপাত যথাক্রমে ১০৩ দশমিক ৬ শতাংশ ও ১০৬ দশমিক ৯ শতাংশ।
বয়স্ক জনগোষ্ঠীর ব্যয় ও দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে কয়েক দশক ধরে জাপানের ঋণ বেড়েছে। বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত ২০০ শতাংশের বেশি। এটিই সর্বোচ্চ।
যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নির্ধারণকারী ফেডারেল রিজার্ভ বুধবার তাদের সর্বশেষ বৈঠকের কার্যবিবরণী প্রকাশ করেছে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ে নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে বলে দেখা গেছে।
কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, গত মাসে সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে ‘বেশ কয়েকজন’ নীতিনির্ধারক ছিলেন। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক টানা পঞ্চমবারের মতো সুদের হার ৩ দশমিক ৫০ থেকে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশের মধ্যে অপরিবর্তিত রেখেছে।
অনেক নীতিনির্ধারক বলেছেন, মূল্যস্ফীতি না কমলে সুদের হার বাড়ানো ‘সম্ভবত প্রয়োজন হবে’। কয়েকজন মনে করেন, মূল্যস্ফীতি ফেডের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যে নামিয়ে আনতে বর্তমান সুদের হার যথেষ্ট নয়।
তবে সাম্প্রতিক তথ্যে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমেছে। জুলাইয়ে কোম্পানিগুলোও অপ্রত্যাশিতভাবে কর্মী ছাঁটাই করেছে। এসব তথ্যের পর সেপ্টেম্বরে ফেডের বৈঠকে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সম্ভাবনাই বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র : বিবিসি







