ট্রাম্পের ‘উল্টো’ কূটনীতিতে নতুন সমীকরণ

ছবি: রয়টার্স
ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতিতে আবারও সামনে এসেছে এক অস্বাভাবিক কূটনৈতিক বৈপরীত্য। দীর্ঘদিনের মিত্রদের ওপর চাপ ও সমালোচনা বাড়াচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, অথচ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষ উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে সম্পর্ককে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরছেন তিনি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—ট্রাম্প কি যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো মিত্রতার কাঠামো বদলে দিয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও তাৎক্ষণিক কৌশলগত স্বার্থকে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে আনছেন?
সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক সামরিক মহড়ার আকার ও সময় কমানোর সিদ্ধান্ত এই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। ১১ দিনের মহড়া কমিয়ে পাঁচ দিনে আনার পাশাপাশি কিছু ফিল্ড ট্রেনিং বাতিল বা সীমিত করা হয়েছে। ট্রাম্পের নির্দেশেই এই পরিবর্তন এসেছে।
ট্রাম্পের যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে কিম জং উনের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক। উত্তর কোরিয়ার নেতাকে তিনি ইতিবাচকভাবে উল্লেখ করে জানিয়েছেন, কিমের সঙ্গে তার যোগাযোগের প্রচেষ্টা থেকে সাড়া পাওয়া গেছে। এর মধ্যেই চলতি বছর কিমের সঙ্গে নতুন করে বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
সম্ভাব্য এই বৈঠক হলে তা হবে ট্রাম্প ও কিমের চতুর্থ মুখোমুখি সাক্ষাৎ। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে দুই নেতার ঐতিহাসিক বৈঠক হলেও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে শেষ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমঝোতা হয়নি। এবার পরিস্থিতি আরও জটিল। কিমের পারমাণবিক সক্ষমতা আগের তুলনায় বেড়েছে এবং রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের কৌশলগত সম্পর্কও শক্তিশালী হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য বিষয়টি তাই বেশ স্পর্শকাতর। দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাত দশকেরও বেশি সময়ের সামরিক জোট রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনাও অবস্থান করছে। এমন পরিস্থিতিতে যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্তকে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন সমালোচকেরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও সিদ্ধান্তটি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস সতর্ক করে বলেছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ মহড়া কমানো উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে ভুল বার্তা দিতে পারে। তাঁর বক্তব্যে মিত্রতার দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাগত গুরুত্বের বিষয়টি সামনে এসেছে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের সঙ্গে কানাডার সম্পর্কও বাণিজ্য ও শুল্ক নিয়ে বারবার উত্তপ্ত হচ্ছে। তবে এখানে চাপের পাশাপাশি দর-কষাকষির কৌশলও দেখা যাচ্ছে। কানাডা থেকে আমদানিতে প্রস্তাবিত ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকরের সময়সীমা পিছিয়ে দিতে সাময়িক সমঝোতায় পৌঁছেছে দুই দেশ। অর্থাৎ ট্রাম্পের কৌশলে মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কও পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া নয়—বরং চাপ সৃষ্টি করে নতুন শর্ত আদায়ের প্রবণতা স্পষ্ট।
মধ্যপ্রাচ্যেও একই ধরনের কঠোরতা দেখা গেছে। ইরান ইস্যুতে ওমানের অবস্থান নিয়ে ট্রাম্প প্রকাশ্যে ক্ষোভ দেখিয়েছেন এবং দেশটির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। অথচ ওমান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগ ও মধ্যস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন অবশ্য উত্তর কোরিয়া ঘিরে। ট্রাম্পের বার্তা হলো—প্রচলিত কূটনৈতিক কাঠামোর বাইরে সরাসরি নেতাদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে অচলাবস্থা ভাঙা সম্ভব। কিন্তু কিমের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে বড় কোনো ছাড়ের ইঙ্গিত নেই।
এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা কমিয়ে সংলাপ পুনরায় শুরু করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে ওয়াশিংটন ও সিউলের মধ্যে মহড়া কমানোর সিদ্ধান্ত একদিকে নতুন কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের প্রতিরোধব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি করছে।
চীনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই দক্ষিণ কোরিয়া সফরে গিয়ে কোরীয় উপদ্বীপের নিরাপত্তা ও উত্তর কোরিয়া ইস্যু নিয়ে আলোচনা করছেন। একই সময়ে পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে বেইজিং ও মস্কোর সম্পর্ক শক্তিশালী হওয়ায় কিম এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
ফলে ট্রাম্পের বর্তমান কূটনীতিতে একটি নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হচ্ছে—মিত্র হলেই ছাড় নয়, আর প্রতিপক্ষ হলেই দূরত্ব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কে কতটা অর্থনৈতিক, সামরিক বা কৌশলগত সুবিধা দিতে পারছে, সেটিই যেন সম্পর্কের নতুন মাপকাঠি হয়ে উঠছে।
এখন দেখার বিষয়, কিমের সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্ক সত্যিই উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সংকটের সমাধানের পথ খুলে দেয় কি না। নাকি মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক সমন্বয় কমিয়ে কিমের দিকে এগিয়ে যাওয়া শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের পুরোনো জোটব্যবস্থাকেই আরও অনিশ্চিত করে তুলবে।






