যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি শিক্ষার্থীদের আবেদনে রেকর্ড পতন

ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে আগ্রহী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহে বড় ধস নেমেছে। চলতি ফল সেশনে মার্কিন কলেজগুলোতে ভর্তির জন্য বিদেশি শিক্ষার্থীদের আবেদন কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। অন্তত এক দশকের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় পতন। ‘কমন অ্যাপে’র বৃহস্পতিবার প্রকাশিত তথ্য বলছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর ভিসানীতি ও বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রবেশ সীমিত করার উদ্যোগের মধ্যেই এই পতন ঘটেছে। ব্লুমবার্গের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য।
২০২৫ সালের তুলনায় এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের কলেজগুলোতে ভর্তির জন্য প্রায় ১৬ হাজার কম বিদেশি শিক্ষার্থী আবেদন করেছেন। ট্রাম্প প্রশাসন বিদেশি শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ সীমিত করতে ভিসাবিধিতে পরিবর্তনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ জোরদার করার সময়ই এই পতন ঘটেছে। কমন অ্যাপে ১ হাজার ১৪৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যা ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের তুলনায় ৪ শতাংশ বেশি।
এই পতনই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত যে চলতি শরতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা বড় ধরনের কমতে পারে। এর ফলে দেশটির অনেক কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বাড়তে থাকা আর্থিক চাপ আরও বাড়বে। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বয়সী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়া এবং উচ্চশিক্ষার মূল্য নিয়ে প্রশ্নের কারণে এসব প্রতিষ্ঠান চাপের মুখে রয়েছে।
কমন অ্যাপের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে আবেদনের সংখ্যা দুই অঙ্কের হারে কমেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবেদন করা ইউরোপীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ৪ শতাংশ কমেছে, যা কয়েক বছর ধরে চলা ধারাবাহিক বৃদ্ধির বিপরীত। এর মধ্যে ফ্রান্স ও জার্মানিসহ কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার সম্ভাবনায় হতাশ শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে নিজেদের উদ্যোগ জোরদার করেছে।
ভিসাবিধিতে পরিবর্তন
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শিক্ষার্থীদের কলেজে আবেদনের সংখ্যা ৪ শতাংশ বেড়েছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে আবেদনের সংখ্যা ৯ শতাংশ বেড়ে যাওয়া।
গত এক বছরে ট্রাম্প প্রশাসন শিক্ষার্থী ভিসার নিয়মে বেশ কয়েকটি পরিবর্তন এনেছে এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সংখ্যা সীমিত করতে সমন্বিতভাবে কাজ করেছে। ২০২৪-২৫ সালের আবেদন প্রক্রিয়ায় বিদেশি আবেদনকারীর সংখ্যা ২০২৩-২৪ সালের তুলনায় মাত্র ১ শতাংশ কমেছিল।
কমন অ্যাপের জ্যেষ্ঠ তথ্যবিজ্ঞানী রডনি হিউজ বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ের এই পতন ২০১৩ সালে ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ শুরু করার পর তাদের দেখা সবচেয়ে বড় পতন।
হিউজ বলেছেন, ‘ভিসা পাওয়া যদি কঠিন হয়ে যায়, তাহলে শিক্ষার্থীদের আবেদনের সম্ভাবনাও কমে যেতে পারে।’
ভিসাধারীদের বিষয় পরিবর্তন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বদল এবং স্নাতক শেষ করার পর যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সুযোগ সীমিত করে কয়েক দশক ধরে চালু থাকা নীতিতে সাম্প্রতিক সময়ের পরিবর্তনের ফলে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তির এই পতনের প্রবণতা আরও তীব্র হতে পারে।
তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভেদে আবেদনের পতনের মাত্রা এক রকম ছিল না। তথ্য বলছে, বৈশ্বিকভাবে বেশি পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় কম পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে পতনের প্রভাব বেশি পড়েছে। সবচেয়ে বাছাইপ্রবণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আবেদনের সংখ্যা মাত্র ১ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, অর্ধেকের বেশি আবেদনকারীকে ভর্তি করা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।
স্যাটে ফিরে আসার প্রবণতা
প্রতিবেদনে উচ্চশিক্ষার আরও কয়েকটি প্রবণতার কথাও উঠে এসেছে। ২০১৯ সালের পর এবারই প্রথমবারের মতো বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী আবেদনের সঙ্গে মানসম্মত পরীক্ষার ফলাফল জমা দিয়েছেন; ফলাফল না দেওয়ার সংখ্যা এবার কমেছে। আগের বছরের তুলনায় স্যাট বা অ্যাক্টের ফলাফল জমা দেওয়া আবেদনকারীর সংখ্যা ১১ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে, পরীক্ষার ফলাফল না দেওয়া আবেদনকারীর সংখ্যা কমেছে ৫ শতাংশ।
হিউজ বলেছেন, ‘পরীক্ষার ফলাফলকে আবার বেশ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।’
ইয়েল, কলাম্বিয়া ও প্রিন্সটনের মতো বেশ কয়েকটি খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় পাঁচ বছর পরীক্ষার ফলাফল ঐচ্ছিক রাখার পর আবার তা বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দেওয়ার পরই এমন পরিবর্তন দেখা গেল। এই সিদ্ধান্ত দেশ জুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত পরীক্ষার ফলাফলের সুবিধা নিয়ে পুরনো বিতর্ক আবার সামনে এনেছে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়া এবং মানসম্মত পরীক্ষার ফলাফলের গুরুত্ব আবার ফিরে আসা—দুটিই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিগত সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট করেছে, পরীক্ষার ফলাফল ঐচ্ছিক রাখার নীতিকে তারা অবৈধ ইতিবাচক বৈষম্য নীতির সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে দেখে। এ ধরনের নীতি সাধারণত নিম্ন আয়ের ও শ্বেতাঙ্গ নয় এমন আবেদনকারীদের বেশি সুবিধা দেয় বলে মনে করা হয়।
তবে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার ফলাফল জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়, সেগুলোর সংখ্যাই এখনো অনেক বেশি। কমন অ্যাপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ৫ শতাংশ কলেজ আবেদনকারীদের স্যাট বা অ্যাক্টের ফলাফল জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করেছে। গত বছর এই হার ছিল ৪ শতাংশ। তবে ২০১৯ সালে ছিল ৫৫ শতাংশ।
সূত্র : ব্লুমবার্গ






