ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কাজ করবে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে এই যুদ্ধ। সামরিক বিজয় কিংবা আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার সম্ভাবনাও ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
অচলাবস্থা কাটানোর জন্য ইরানকে একঘরে করতে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ চালুর হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এর আওতায় ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা যেকোনো দেশকে ‘ভয়াবহ’ অর্থনৈতিক পরিণতির মুখে পড়তে হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
তবে দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে রয়েছে ইরান। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশটি অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ সহ্য করার পাশাপাশি তা মোকাবিলায় নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও দেখিয়েছে।
এমন বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বড় প্রশ্ন— আগের কৌশলগুলো যেখানে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে কি কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে? বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধে আশানুরূপ ফল না পেয়ে নতুন এই কৌশল নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই পদক্ষেপের সুনির্দিষ্ট কাঠামো এখনও স্পষ্ট নয়। তবে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ২৪ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন তিনি।
সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট স্পষ্ট করেছেন, ইরানকে সহায়তা করছে বলে মনে হলে বন্ধু বা শত্রু— যেকোনো দেশের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র।
তিনি বলেছেন, ‘আপনি হয় আমাদের সঙ্গে, নয়তো আমাদের বিরুদ্ধে। আপনি যদি ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যেতে চান, তাদের তেল কেনেন কিংবা সমুদ্রপথে পণ্য বিনিময় করেন, তবে যুক্তরাষ্ট্র আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তার পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করবে।’
এই নিষেধাজ্ঞাকে সংঘাতের ‘নতুন পর্যায়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার মতে, অর্থনৈতিক চাপই এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা ‘সবচেয়ে কার্যকর’ হাতিয়ার।
এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করছে। তবে গত কয়েক সপ্তাহে ইরানই যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি চাপ অনুভব করেছে।
ভ্যান্স বলেছেন, আমরা এই চাপ অব্যাহত রাখবো, কারণ চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য এটিই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রায় শুরু থেকেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে রয়েছে ইরান। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে করা পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। এরপর থেকে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ে।
চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ ঘোষণা করেছে। এর আওতায় মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ইরানের সরকারি আর্থিক লেনদেনের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের বন্দরগুলোকে লক্ষ্য করে নৌ অবরোধ পরিচালনা করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটনের আটলান্টিক কাউন্সিলের ভূকৌশল বিশেষজ্ঞ ও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের সাবেক নীতি উপদেষ্টা ইমরান বায়োমি বলেছেন, ট্রাম্পের নতুন ঘোষণা সম্ভবত অন্যান্য কৌশল কাঙ্ক্ষিত ফল না দেওয়ায় ক্রমবর্ধমান হতাশারই প্রতিফলন।
তার ভাষায়, ‘এটি মূলত স্বীকার করে নেওয়া যে, যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে প্রায় আটকে গেছে। এটি অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের আরেকটি প্রচেষ্টা।’
তার মতে, প্রশাসন সামরিক বা অর্থনৈতিক কোনো হাতিয়ার ব্যবহার করে কী অর্জন করতে চাইছে, তার সুস্পষ্ট কৌশল এখনও সামনে আসেনি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত লক্ষ্য কী, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।
মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বিশেষজ্ঞ এবং দেশটির ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল অফিসের সাবেক কর্মকর্তা মাইকেল পার্কারের মত, নতুন এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হতে পারে নিষেধাজ্ঞার ‘অর্থনৈতিক পরিধি’ আরও বাড়ানো।
এর আওতায় ইরানের সঙ্গে এখনও ব্যবসা করা দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ এই আওতায় আসতে পারে, যাদের অর্থনীতি মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরশীল।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি হাতিয়ার ব্যবহার করতে যাচ্ছে, যা এখনও পুরোপুরি ব্যবহার করেনি তারা। উদাহরণ হিসেবে তিনি সেসব বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করেন, যারা ইরানকে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করে বা ইরানের কোষাগারে অর্থ পাঠায়।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই পদক্ষেপের জবাবে ইরান কী করবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান এখন পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা এড়াতে বেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।
তেল পরিবহনের জন্য ‘শ্যাডো’ জাহাজ ব্যবহার কিংবা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় না থাকা নতুন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের মতো বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক পথ তৈরি করেছে দেশটি।






