শহর জুড়ে শুধু স্বজন খোঁজার আর্তি
লাশ আর লাশ, ঠাঁই নেই মর্গেও

সংগৃহীত ছবি
কারও দেহ আসছে মোটরসাইকেলের পেছনে, কেউ আবার স্বজনের নিথর শরীর তুলে আনছেন ব্যক্তিগত গাড়িতে। কোথাও পিকআপ ভ্যানের খোলা পাটাতনে শুয়ে আছে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহ। ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে এখন যেন শোকের মিছিল। একের পর এক দেহ এসে পৌঁছাচ্ছে বেলো মন্টে মর্গে। কিন্তু সেই মর্গও আর চাপ সামলাতে পারছে না।
গত বুধবার পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ভেনেজুয়েলার ক্যারিবীয় উপকূল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ১ হাজার ৪৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ধসে পড়েছে শত শত বহুতল ভবন। এখনো হাজার হাজার মানুষের খোঁজ মেলেনি। দেশের ১২৬ বছরের ইতিহাসে এত বড় ভূমিকম্পজনিত বিপর্যয় আর দেখা যায়নি।
তবে বেলো মন্টে মর্গের বাইরে এখন ভিড় শুধু মরদেহের নয়, স্বজনহারা মানুষেরও। কেউ ছবি হাতে দাঁড়িয়ে, কেউ নামের তালিকায় চোখ বুলিয়ে খুঁজছেন প্রিয়জনের চিহ্ন। মনোবিদ্যার ছাত্রী কামিলা রদ্রিগেজ সেখানে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে শোকাহত পরিবারগুলোকে মানসিক সহায়তা দিচ্ছেন। তার কথায়, গতকাল পুরো রাস্তা ভরে গিয়েছিল মানুষের ভিড়ে।
সেই ভিড়ের মধ্যেই অপেক্ষা করছিলেন মারজোরি সেদেনো। এক মুহূর্তে হারিয়েছেন মা, বাবা ও ভাইকে। কারাকাসের অভিজাত এলাকা লস পালোস গ্রান্দেসে তাদের চারতলা আবাসন ধসে পড়ে। শুক্রবার রাত পর্যন্ত তিনি শুধু ভাই হোসে রুইসের দেহ শনাক্ত করতে পেরেছিলেন।
৪৪ বছরের সেই ভাই নাকি ভূমিকম্পের সময় বাড়ির বাইরে ছিলেন। কিন্তু মা-বাবাকে বাঁচাতে ফের ভেতরে ঢুকে পড়েন। আর বেরোতে পারেননি। তার মা জোইলা সেদেনো (৭২) ও বাবা জাসিন্তো রুইসের (৭৪) দেহ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচেই চাপা পড়ে রয়েছে। মারজোরির কথায়, মর্গের ভেতরের দৃশ্য ভাষায় বোঝানো যাবে না। এমন ট্র্যাজেডি যেন কারও জীবনে না আসে।
একই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন বেলকিস সেদেনো। উপকূলবর্তী লা গুইরার বাসিন্দা তার ৫৬ বছরের আত্মীয় মারিয়া এলেনা মোরেনোর খোঁজে এসেছিলেন তিনি। দশতলা আবাসন ভবনটি মুহূর্তে মাটিতে মিশে যায়। প্রথমে খবর এসেছিল, মারিয়া জীবিত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছেন। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া সুনামি সতর্কবার্তার জেরে উদ্ধারকাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই মৃত্যু হয় তার।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় এগিয়ে এসেছেন সাধারণ মানুষ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শেষকৃত্য পরিষেবার কর্মীরা দুই শতাধিকের বেশি কফিন, দেহ রাখার ব্যাগ ও অন্যান্য সামগ্রী দান করেছেন। স্বেচ্ছাসেবীরা দিচ্ছেন পানি, খাবার, কফি ও মানসিক সহায়তা। শহরের বিভিন্ন রাস্তায় তাঁবু টানিয়ে আশ্রয় নিয়েছে শত শত পরিবার। আতঙ্কে অনেকেই আর বাড়িতে ফিরে যেতে সাহস পাচ্ছেন না।
এদিকে উদ্ধারকাজ নিয়ে সরকারের ভূমিকায় বাড়ছে ক্ষোভ। বহু মানুষের অভিযোগ, বিপর্যয়ের প্রথম কয়েক ঘণ্টায় তাদের কার্যত নিজেদের ভাগ্যের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তবু ধ্বংসস্তূপ, মৃত্যুর গন্ধ আর দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যেও মানবতার আলো নিভে যায়নি। মর্গের বাইরে দাঁড়িয়ে মারজোরি সেদেনো বলছিলেন, সরকারি সাহায্য হয়তো নেই। কিন্তু মানুষের সাহায্যের কোনো অভাব নেই। এই কঠিন সময়ে মানুষই মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।






