কেন আবারও চীন সফরে যাবেন পুতিন?

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সব শেষ বেইজিং সফর করেন পুতিন
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন খুব শিগগিরই চীন সফরে যাবেন। আজ বৃহস্পতিবার এমনটাই জানিয়েছে ক্রেমলিন। রুশ কর্মকর্তারা বলছেন, এই সফরের প্রস্তুতি এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে মস্কো ও বেইজিংয়ের মধ্যে গভীরতর অংশীদারত্বের পথে আরেকটি বড় পদক্ষেপের।
এই ঘোষণাটি এমন এক সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক মুহূর্তে এসেছে, যা ইউক্রেন যুদ্ধ, পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক জোট, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে চিহ্নিত। বিশেষ করে এমন সময়ে পুতিনের সম্ভাব্য বেইজিং সফরের ঘোষণা এলো, যখন ট্রাম্পও বর্তমানে চীন সফরে রয়েছেন। ফলে শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অংশ হিসেবেই নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও দেখা হচ্ছে এই সফরকে।
ক্রেমলিন কী বলছে
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, পুতিনের চীন সফর খুব শিগগিরই অনুষ্ঠিত হবে এবং এর প্রস্তুতি এরই মধ্যেই চূড়ান্ত করা হয়েছে।
যদিও মস্কো নির্দিষ্ট তারিখ প্রকাশ করেনি, তবে এ ধরনের ঘোষণা সাধারণত তখনই দেওয়া হয় যখন দুদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সমন্বয় প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে যায়। ফলে বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর শুধু আনুষ্ঠানিক বৈঠক নয়, বরং ভবিষ্যৎ কৌশলগত সমন্বয়ের রূপরেখা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হতে পারে।
সফরটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
তীব্র পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার এই সময়ে রাশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন।
২০২২ সাল থেকে মস্কো এবং বেইজিং বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে সহযোগিতা প্রসারিত করেছে। যার মধ্যে রয়েছে শক্তি, বাণিজ্য, ব্যাংকিং, সামরিক সমন্বয়, প্রযুক্তি, কূটনীতি ইত্যাদি।
ধারণা করা হচ্ছে, এই সম্পর্ককে আরও গভীর ও কাঠামোগত রূপ দিতে পারে পুতিনের আসন্ন সফর।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ এটি এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ দৃশ্যমান। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব মোকাবিলার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে নিজেদের বিকল্প শক্তিকেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরছে মস্কো ও বেইজিং।
একই সময়ে ট্রাম্পের চীন সফর এই বার্তাও দিচ্ছে, বেইজিংকে ঘিরে কূটনৈতিক অবস্থান পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন অনুভব করছে ওয়াশিংটনও। ফলে অনেকেই চীনকে কেন্দ্র করে চলমান বৈশ্বিক কূটনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখছেন পুতিনের সফরকে।
পুতিন ও শি কতটা ঘনিষ্ঠ
বিশ্ব নেতাদের মধ্যে অন্যতম ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন পুতিন ও শি। এই দুই নেতা বছরের পর বছর ধরে ৪০ বারেরও বেশি সাক্ষাৎ করেছেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাদের সর্বশেষ বৈঠকটি।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই সম্পর্ক নাটকীয়ভাবে আরও জোরদার হয়, যখন রাশিয়া ইউক্রেনে তার সামরিক অভিযান শুরু করার ঠিক আগে ঘোষণা করে একটি ‘সীমাহীন’ কৌশলগত অংশীদারত্ব।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বোঝাপড়া দুদেশের সম্পর্ককে শুধু অর্থনৈতিক বা কৌশলগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোতে সমন্বিত অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রও তৈরি করেছে এটি।
যদিও চীন ইউক্রেন সংঘাতে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ এড়ানোর চেষ্টা করে মস্কোর সঙ্গে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এতে বোঝা যায়, চীন একদিকে পশ্চিমাদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায় না, অন্যদিকে কৌশলগতভাবে দুর্বল হতে দিতে আগ্রহী নয় রাশিয়াকেও।
‘সীমাহীন’ অংশীদারত্ব কী
‘সীমাহীন’ অংশীদারত্ব হলো একটি রাজনৈতিক কাঠামো, যা ২০২২ সালের শুরুতে ঘোষণা করেছিল রাশিয়া ও চীন।
সম্প্রসারিত অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যৌথ ভূ-রাজনৈতিক সমন্বয়, জ্বালানি চুক্তি, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে কূটনৈতিক সমর্থন, নিরাপত্তা সংলাপ, সামরিক মহড়া ইত্যাদি এই অংশীদারত্বের অন্তর্ভুক্ত বিষয়।
তবে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, এই অংশীদারত্ব ন্যাটোর মতো কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট নয়। এর কারণ হলো, চীন এখনো বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত এবং পশ্চিমা বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বেইজিং এমন একটি অবস্থান বজায় রাখতে চায়, যেখানে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও থাকবে, আবার পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতাও তৈরি হবে না।
চীনকে এত প্রয়োজন কেন রাশিয়ার
ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে চীনের ওপর রাশিয়ার নির্ভরশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অনেক ইউরোপীয় দেশ রাশিয়ার জ্বালানি আমদানি কমিয়ে দেওয়ার পর এবং পশ্চিমা কোম্পানিগুলো রাশিয়ার বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর, মস্কো তার বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এশিয়ার দিকে, বিশেষ করে চীনের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।
রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের প্রধান ক্রেতা চীন। এ ছাড়া রাশিয়ায় শিল্পজাত পণ্য এবং ইলেকট্রনিক্সের সরবরাহকারীও চীন। চীন এমন একটি আর্থিক অংশীদার, যা রাশিয়াকে কিছু পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করে। পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাশিয়ার একটি কূটনৈতিক মিত্রও তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, এ সম্পর্ক এখন শুধু অর্থনৈতিক সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি রাশিয়ার আন্তর্জাতিক টিকে থাকার কৌশলের অংশ হয়ে উঠেছে। পশ্চিমা চাপের মুখে মস্কোর জন্য বেইজিং এখন কার্যত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক শক্তি।
চীনের লাভ কী
রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা থেকে চীন বেশকিছু কৌশলগত সুবিধা লাভ করে। চীনকে বিপুল পরিমাণে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং অন্যান্য কাঁচামাল সরবরাহ করে রাশিয়া। মস্কোর সঙ্গে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করতে সাহায্য করে বেইজিংকে।
রাশিয়ার কাছে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ এবং আর্কটিক অঞ্চলের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, যা চীনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
চীন ও রাশিয়া প্রায়শই ন্যাটো, তাইওয়ান, নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক শাসন, সংস্কার সম্পর্কিত বিষয়ে তাদের অবস্থান সমন্বয় করে। বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো— রাশিয়াকে পাশে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাবের বিপরীতে একটি বিকল্প শক্তি কাঠামো গড়ে তোলা।
তবে চীন একই সঙ্গে সতর্ক অবস্থানও বজায় রাখছে। কারণ ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র এখনো চীনের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে। ফলে বেইজিং এমন ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়, যাতে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও অটুট থাকে এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
ইউক্রেন যুদ্ধ কি আলোচনায় থাকবে
পুতিনের সফরকালে ইউক্রেনের যুদ্ধ প্রায় নিশ্চিতভাবেই একটি প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে।
পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক ও আর্থিক চাপের মুখোমুখি হয়েও আন্তর্জাতিক সমর্থন ও অর্থনৈতিক সহায়তা চেয়ে চলেছে রাশিয়া। চীন বারবার আলোচনা এবং রাজনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টার আহ্বান জানিয়েছে, কিন্তু পশ্চিমা সরকারগুলো পরোক্ষভাবে রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে তার যুদ্ধ প্রচেষ্টা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করার জন্য অভিযুক্ত করে বেইজিংকে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে প্রকাশ্যে বড় কোনো ঘোষণা না এলেও, যুদ্ধপরবর্তী আন্তর্জাতিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং পশ্চিমা চাপ মোকাবিলার কৌশল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে দুদেশের মধ্যে।
ক্রেমলিনের সাম্প্রতিক বিবৃতিগুলো থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, মস্কো মনে করে এই সংঘাত একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের দিকে এগোচ্ছে, যদিও এর তীব্র বিরোধিতা করে ইউক্রেন।




