কয়েক দশক ধরে বিতর্কের কেন্দ্রে পিকাসোর যে চিত্রকর্ম

ছবি: বিবিসি
পাবলো পিকাসো ১৯০৭ সালের এক সকালে তার স্টুডিওতে ডাকলেন একদল শিল্পী বন্ধুকে। তাদের দেখালেন গত ছয় মাস ধরে গোপনে আঁকা এক আজব ছবি। সেই ছবি দেখা মাত্রই উপস্থিত সবার মনে জাগল চরম ঘৃণা আর আতঙ্ক।
ফরাসি শিল্পী জর্জেস ব্রাক তো বলেই বসলেন যে এই ছবি দেখা আর পেট্রোল গেলা সমান কথা, এমনকি অঁরি মাতিসও ছবির নারীদের বললেন কুৎসিত। বন্ধুদের এমন জঘন্য প্রতিক্রিয়ার ভয়ে পিকাসো সেই ছবি জনসমক্ষে আনলেন না প্রায় এক দশক পর্যন্ত।
আজ ১০০ বছর পরেও পিকাসোর সেই ‘লে ডেমোইসেলস ডি’অ্যাভিগনন’ ছবিটি রয়ে গেছে ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত শিল্পকর্ম হয়ে। সম্প্রতি মার্কিন চিত্রশিল্পী হেনরি টেলর এই ছবিটিকে রাঙিয়েছেন নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে।
প্যারিসের এক প্রদর্শনীতে এখন শোভা পাচ্ছে টেলরের সেই নতুন সংস্করণ। টেলর এখানে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন যে পিকাসো তার এই বিখ্যাত ছবিতে আসলে আফ্রিকার শিল্পকলা থেকে অনেক কিছু করলেও তিনি তা কখনোই করতে চাননি স্বীকার।
পিকাসোর সেই মূল ছবিতে দেখা যায় বার্সেলোনার এক নিষিদ্ধ পল্লীর পাঁচজন নগ্ন নারীকে যারা সরাসরি তাকিয়ে আছে দর্শকের চোখের দিকে। তাদের শরীরের হাড়গোড় সব ত্যাড়াবেঁকা আর জ্যামিতিক নকশার মতো দেখায় বলে তৎকালীন প্রথাগত শিল্পের সব নিয়ম সেখানে গেছে টুটে।
পিকাসোর এই দুঃসাহসী পদক্ষেপই পরবর্তীকালে জন্ম দিল ‘কিউবিজম’ বা ঘনকবাদের যা আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাসে আনল এক অভাবনীয় মোড়।
পিকাসো আসলে কঙ্গো থেকে আসা এক ছোট কাঠের মূর্তির প্রেমে পড়ে নিজের আঁকার ধরনে আনেন আমূল পরিবর্তন। তিনি নৃতাত্ত্বিক জাদুঘরে দিনের পর দিন সময় কাটিয়ে শত শত স্কেচ তৈরি করলেও ১৯২০ সালে এক সাক্ষাৎকারে বুক ফুলিয়ে মিথ্যে বললেন যে তিনি আফ্রিকার শিল্পের নামও শোনেননি কোনোদিন।
পিকাসোর এই একগুঁয়েমিকে এখনকার গবেষকরা দেখছেন এক ধরণের চৌর্যবৃত্তি হিসেবে কারণ তিনি আফ্রিকান সংস্কৃতির মহিমা ব্যবহার করলেও বিনিময়ে দেননি কোনো স্বীকৃতি।
হেনরি টেলর তার নতুন ছবি ‘ফ্রম কঙ্গো টু দ্য ক্যাপিটাল অ্যান্ড ব্ল্যাক এগেইন’-এ ইতিহাসের সেই ভুলগুলো শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি পাঁচজন নগ্ন নারীর অবয়ব ঠিক রেখে গায়ের চামড়াকে সাদা থেকে করে দিয়েছেন কুচকুচে কালো।
টেলর এখানে নারী চরিত্রগুলোকে করেছেন অনেক বেশি শক্তিশালী আর তাদের চেহারায় এনেছেন বিশ্বখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ তারকা জোসেফাইন বেকারের আদল। ছবির এক কোণায় সোনার ঘড়ি পরা এক সাদা চামড়ার হাত দেখিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে কীভাবে নারীরা যুগে যুগে লালসার শিকার হয়েছে।
পিকাসোর সেই বন্ধু জর্জেস ব্রাক শুরুতে নাক সিটকালেও পরে তিনি নিজেও আঁকতে শুরু করলেন এই একই অদ্ভুত ঢঙে। ১৯২০ সালের দিকে যখন লেখক আন্দ্রে ব্রেটন ছবিটিকে বৈপ্লবিক বলে ঘোষণা দিলেন তখন থেকেই এটি মাস্টারপিস হিসেবে পেল মর্যাদা।
১৯৩৯ সালে নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট ছবিটি বিপুল অর্থে কিনে নেয়। তারপর থেকে আজও এটি একই সঙ্গে বিতর্কিত, ঘৃণিত ও প্রশংসিত অমর এক শিল্পকর্ম হয়ে বেঁচে আছে পৃথিবীর বুকে।
সূত্রঃ বিবিসি





