যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে মেধার লড়াই
গাজায় কেউ পেল দেশের সেরা ফল, কেউ ফল প্রকাশের আগেই হারাল জীবন

সাবা রাবাহ বিজ্ঞান বিভাগে ৯৯.৯ শতাংশ নম্বর পেয়ে পুরো ফিলিস্তিনে প্রথম হয়েছেন।
যে দিনটি সাধারণত উচ্ছ্বাস আর নতুন স্বপ্নের সূচনা হিসেবে মনে রাখে এক একজন শিক্ষার্থী, গাজার হাজারো কিশোর-কিশোরীর কাছে সেই দিনই পরিণত হয়েছে ভয়াবহ শোকে। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা ভূখণ্ডে উচ্চ মাধ্যমিক সমমানের ‘তাওজিহি’ পরীক্ষার ফল প্রকাশ এ বছর যেন শুধু মেধার নয়। বেঁচে থাকারও এক নির্মম সাক্ষ্য হয়ে উঠেছে।
কেউ দেশের সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েও পিতাকে হারানোর শোক ভুলতে পারেনি। আবার কেউ অসাধারণ ফল করার পরও নিজের ফলাফল না দেখেই নিহত হয়েছে ইসরায়েলি হামলায়।
প্রায় তিন বছর পর চলতি বছরের জুনে গাজা, পশ্চিম তীর, মিসর এবং বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য একযোগে অনুষ্ঠিত হয় এ পরীক্ষা। দীর্ঘদিন যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পরেও হাজার হাজার শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নেয়।
জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে ফলাফল প্রকাশিত হলে সামনে আসে যুদ্ধের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া বহু ছাত্র-ছাত্রীর অনুপ্রেরণাদায়ক কাহিনি।
মধ্য গাজার আল-মাঘাজি শরণার্থী শিবিরে থাকা ছাত্রী সাবা রাবাহ বিজ্ঞান বিভাগে ৯৯.৯ শতাংশ নম্বর পেয়ে পুরো ফিলিস্তিনে প্রথম হয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন তার। বাবা-মাও সেই স্বপ্নকেই লালন করেছিলেন।
কিন্তু ফল প্রকাশের আগে ইসরায়েলি হামলায় পাশের ভবনে আঘাত হানার সময় নিহত হয় তার বাবা। দীর্ঘ কষ্টার্জিত সাফল্যের মুহূর্ত তাই আনন্দের বদলে পরিণত হয় শোকে।
সাবা জানিয়েছেন, পরীক্ষার কয়েক দিন আগেই তাদের আশ্রয়স্থলেও হামলা চালানো হয়। তাই রান্না, ঘুম আর দৈনন্দিন জীবন চলত যে একমাত্র অক্ষত ঘরে। সেখানেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার সময় বই, মায়ের ওষুধ আর পক্ষাঘাতগ্রস্ত ভাই- কাকে আগে বাঁচাবেন, সেই কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হয়েছে তাকে।
এমনকি নতুন পাঠ্যবই পর্যন্ত নেই, কাগজের মাত্রারিক্ত দাম, অনিয়মিত বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট এইসব প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি স্বপ্ন ছাড়েননি। তার কথায়, গাজার প্রতিটি পরিবারই প্রিয়জন হারানোর বেদনা বহন করছে। তবু মানুষ মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে ও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়।
উত্তর গাজার আরেক শিক্ষার্থী মারাম মুকিতের গল্পও যেন একই রকম হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক। পরীক্ষার মাত্র চার মাস আগেই ইসরায়েলি গুলিতে তার মেরুদণ্ডে গুরুতর চোট লাগে। শরীরের একাংশ অবশ হয়ে যাওয়ার পর হাসপাতালের পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়া অবস্থাতেই তিনি পরীক্ষায় বসেন।
যদিও শেষ পর্যন্ত ৯৬.৬ শতাংশ নম্বর পেলেও পরিবারের আনন্দ অশ্রুতে পরিণত হয়। কারণ তিনি এখনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন না। তার স্বপ্ন ছিল একজন দন্তচিকিৎসক হওয়ার। এখন সেই স্বপ্নের সঙ্গে জুড়ে গেছে আরেকটি চাওয়া— একটি বৈদ্যুতিক হুইলচেয়ার, বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ। এ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার অধিকার।
আবার পশ্চিম গাজা সিটির বাসিন্দা ইয়াহইয়া নাসমান ৯৬.৬ শতাংশ নম্বর পান। কিন্তু ফল প্রকাশের এক সপ্তাহ আগে পরিবারের পাঁচ সদস্যের সঙ্গে ইসরায়েলি বিমান হামলায় প্রাণ হারান। স্থাপত্য প্রকৌশলী হয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার ভাঙা বাড়িগুলো পুনর্নির্মাণ করার স্বপ্ন ছিল ইয়াহইয়ার।
পরীক্ষা শেষে সবার সঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও কথা বলেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন ধ্বংসস্তূপের নিচেই চাপা পড়ে গেল।
ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। নিহতের সংখ্যা প্রায় উনিশ হাজারের কাছাকাছি। এ ছাড়াও প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৮০০ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী।
পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং ধ্বংস হয়েছে ২৭৯টি বিদ্যালয়। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সত্ত্বেও হামলা অব্যাহত থাকায় গাজার শিক্ষাব্যবস্থা প্রায় ধ্বংসের মুখে। তাই গাজার এবারের তাওজিহি পরীক্ষার্থীরা এমন এক প্রজন্ম, যারা বইয়ের পাতার পাশাপাশি প্রতিদিন মৃত্যুভয়, ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি আর প্রিয়জন হারানোর বেদনাকে সঙ্গী করে ভবিষ্যতের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।






