গাজায় শোধনাগার ধ্বংস করেছিল ইসরায়েল, এখন নিজেরাই পানি সংকটে

খাবার পানি বহন করছে গাজার দুই শিশু। ফাইল ছবি / রয়টার্স
গাজায় পানি শোধনাগার ও পয়ঃনিষ্কাশন অবকাঠামো ধ্বংসের কারণে বিপুল পরিমাণ ময়লাযুক্ত পানি ভূমধ্যসাগরে গিয়ে পড়ছে। এতে ইসরায়েলেও সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অস্বাভাবিক শৈবাল বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশটির ছয়টি প্রধান লবণমুক্তকরণ কেন্দ্রের পাঁচটিই কয়েক দিনের জন্য বন্ধ রাখতে হয়েছে। বর্তমানে সেগুলো সীমিতভাবে চলছে।
ইসরায়েলি পরিবেশবাদী সংগঠন জালুল এনভায়রনমেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, গাজা থেকে অপরিশোধিত বর্জ্যপানি সাগরে পড়ায় ইসরায়েলের লবণমুক্তকরণ কেন্দ্রগুলোর সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। বর্জ্যপানিতে থাকা নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের মতো পুষ্টি উপাদান মাইক্রোঅ্যালজি ও সায়ানোব্যাকটেরিয়া বাড়াতে সহায়তা করে। এর ফলে ব্যাপকভাবে শৈবাল ছড়িয়ে পড়তে পারে।
প্রায় তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধের পর গাজার পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রভাব এখন ইসরায়েলেও পড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। গাজার উপকূল থেকে ইসরায়েলের আশদোদ পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ শৈবালের স্তর তৈরি হয়েছে। এতে লবণমুক্তকরণ কেন্দ্রগুলোর ফিল্টার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
বেন গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জাকারবার্গ ইনস্টিটিউট ফর ওয়াটার রিসার্চের এমেরিটাস অধ্যাপক ও লবণমুক্তকরণ বিশেষজ্ঞ জ্যাক গিলরন বলেছেন, ‘গাজা থেকে অপরিশোধিত ময়লা পানি সাগরে পড়ায় দক্ষিণ ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে ইসরায়েলের পানি উৎপাদন অবকাঠামোর ঝুঁকি বাড়ছে। বর্তমান ঘটনা ইসরায়েলের পানীয় জলের অন্যতম প্রধান উৎসের বিরুদ্ধে হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করেছে।’
মেডিসিনস সানস ফ্রন্টিয়ার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। কূপ, পানি সরবরাহের লাইন, জলাধার ও লবণমুক্তকরণ ইউনিটেও সরাসরি হামলা হয়েছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গাজার পানির সংকটও ভয়াবহ আকার নিয়েছে। যুদ্ধের আগে ভূখণ্ডটির প্রায় ৮০ শতাংশ পানি উপকূলীয় অঞ্চলের নিচে থাকা একটি ভূগর্ভস্থ জলাধার থেকে আসত। বর্তমানে সমুদ্রের পানি ও বর্জ্যপানি মিশে সেটিও দূষিত হয়েছে। ফলে পানি মানুষের ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
গাজার অধিকাংশ খাবার পানি আসত লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র এবং ইসরায়েলি পানি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন তিনটি পাইপলাইন থেকে। যুদ্ধ শুরুর পর এসব পাইপলাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে সেগুলো আংশিকভাবে চালু করা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত বিতরণ ব্যবস্থা ও ধ্বংস হওয়া অবকাঠামোর কারণে বহু মানুষ এখন পানির ট্রাকের ওপর নির্ভরশীল।
বেইত লাহিয়ার ৩৪ বছর বয়সী পাঁচ সন্তানের মা নাস আল বারাউই বলেছেন, ‘আমরা জেরিক্যানে পানি বহন করি। ভারী পাত্র নিয়ে হাঁটি অথবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করি। পানির বড় একটি অংশ অনিরাপদ। শিশুরা বারবার পেটের সংক্রমণ, ডায়রিয়া ও ত্বকের সমস্যায় ভুগছে। ক্ষতিগ্রস্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও নষ্ট পাম্পের কারণে তাঁবু এবং আবাসিক এলাকার মধ্য দিয়ে বর্জ্যপানি প্রবাহিত হচ্ছে।’
গাজার কোস্টাল মিউনিসিপ্যালিটিজ ওয়াটার ইউটিলিটির উপনির্বাহী পরিচালক ওমর শাতাত জানিয়েছেন, গাজার পাঁচটি বর্জ্যপানি শোধনাগারই বন্ধ রয়েছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্যপানি ভূমধ্যসাগরে গিয়ে পড়ছে।
এ ছাড়া আল মাওয়াসির অনানুষ্ঠানিক শিবিরসহ বিভিন্ন এলাকায় সোকঅ্যাওয়ে পিট থেকে প্রতিদিন আরও প্রায় ১৫ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্যপানি ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশছে।
শাতাত বলেছেন, ‘পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি বিপর্যয়কর পরিস্থিতি। সাগর মারাত্মকভাবে দূষিত। সবচেয়ে আগে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গাজার বাসিন্দা ও বাস্তুচ্যুত মানুষ। কারণ তারা বর্জ্যপানির সবচেয়ে বেশি ঘনত্বের সরাসরি সংস্পর্শে রয়েছে।’
গাজা সিটিতে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির মুখপাত্র প্যাট গ্রিফিথস বলেছেন, শীত শুরু হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তিনি বলেছেন, ‘ফিলিস্তিনিরা বর্জ্যপানি দিয়ে ঘেরা অবস্থায় বসবাস করছে। এটি তাদের চারপাশে। যেখানে তারা খায়, পানি সংগ্রহ করে এবং হাঁটে, সেখানেও এটি রয়েছে।’
গাজায় ইঁদুরের উপদ্রবও বেড়েছে। কাঁচা বর্জ্যপানি, বাস্তুচ্যুত মানুষের অতিরিক্ত ভিড় এবং জমে থাকা আবর্জনার কারণে ইঁদুরের সংখ্যা বাড়ছে। গাজার সীমান্তবর্তী ইসরায়েলি এলাকাতেও ইঁদুরের ব্যাপক উপদ্রব দেখা দিয়েছে।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত মানুষকে পানি ‘সাবধানে’ ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পানি সরবরাহ কমানো হয়েছে। কৃষকদের সেচ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এর ফলে খাদ্যের দাম বাড়তে পারে।
জালুল ও ইকোপিস মিডল ইস্ট গাজার পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়তা এবং ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বর্জ্যপানি শোধনের সুযোগ দিতে গাজার প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ইসরায়েলি সংস্থা কোগাটের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তবে কোগাট এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
জালুল বলেছে, ‘দূষণ অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো দেশেই অনুভূত হতে পারে। সামুদ্রিক পরিবেশ দূষিত হলে মানুষ ও প্রকৃতি উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা সীমান্তের যে পাশেই থাকুক না কেন।’
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান




