স্কুল নেই তাঁবুতেই জীবন, তবু পরীক্ষার ঘণ্টা গাজায়

সংগৃহীত ছবি
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। দেইর আল-বালাহর তাঁবুর সারি পেরিয়ে হাঁটা শুরু করেন ১৮ বছরের তরুণী ডানা শাবাত। হাতে বই নেই, কাঁধে স্কুলব্যাগও নেই। আছে শুধু একটি মোবাইল ফোন আর ভবিষ্যতকে আঁকড়ে ধরে রাখার একরাশ জেদ। এক ঘণ্টা হেঁটে তাকে পৌঁছাতে হবে একটি ক্যাফেতে। সেখানেই বসে দিতে হবে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। গাজার এই তরুণীর কাছে
উচ্চ মাধ্যমিকের ‘তাওজিহি’ পরীক্ষা শুধু একটি পরীক্ষা নয়, যুদ্ধের অন্ধকার ভেদ করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার শেষ ভরসা। পড়াশোনায় বরাবরই অসাধারণ ডানা। স্বপ্ন দেখেন বিদেশে বৃত্তি নিয়ে পড়ার। চিকিৎসাবিজ্ঞান, অর্থনীতি কিংবা ব্যবসা— কোন পথে যাবেন, তা এখনো স্থির করেননি তিনি। কিন্তু গাজার অনিশ্চয়তা ছেড়ে একদিন নতুন জীবন গড়তে চান। আলজাজিরা।
সেই পথ অবশ্য সহজ নয়। আড়াই বছরেরও বেশি সময় চলা ইসরায়েলি হামলায় ওলটপালট হয়ে গেছে তার জীবন। গত বছরের মে মাসে এক হামলায় প্রাণ হারান তার মা লিনা। উত্তর গাজার বেইত হানুনে তাদের বাড়ি এখন প্রায় ধ্বংসস্তূপ। তাই বাবা ও ভাইবোনদের নিয়ে মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহে একটি তাঁবুই এখন তাদের ঠিকানা।
যুদ্ধে গাজার অসংখ্য স্কুল ধ্বংস হয়েছে। অনেক স্কুল আবার আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ফলে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়েছে অনলাইনে। পরীক্ষাও হচ্ছে সেভাবেই। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠে এক ঘণ্টা হেঁটে ক্যাফেতে পৌঁছান ডানা। সেখানে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের ভরসায় মোবাইল ফোনে পরীক্ষা দেন।
এ বছর গাজায় প্রায় ৩৭ হাজার ছাত্র-ছাত্রী এই পরীক্ষায় বসছে। তাওজিহি পরীক্ষা শুরু হয়েছে ২০ জুন এবং শেষ হবে ৮ জুলাই। যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম পশ্চিম তীরের প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে পরীক্ষা হচ্ছে। তবে পার্থক্য একটাই— পশ্চিম তীরে পরীক্ষার্থীরা বসছে স্কুলের বেঞ্চে আর গাজার ছাত্রছাত্রীরা ক্যাফের টেবিলে।
ডানার বাবা মুহান্না শাবাত যুদ্ধের আগে রসায়নের শিক্ষক ছিলেন। সংসারের নানা প্রয়োজন কমিয়ে মেয়ের পড়াশোনার জন্য ব্যক্তিগত শিক্ষকের খরচ জুগিয়েছেন। তার কথায়, ‘একসময় আমাদের সুন্দর বাড়ি ছিল, স্থির জীবন ছিল। এখন সব হারিয়ে আমরা তাঁবুতে থাকি। তবু মেয়েদের পড়াশোনা থামতে দিইনি।’
বাড়ি ফিরে ডানাকে ঘিরে ধরে ছোট বোনরা। পরীক্ষার খবর জানতে চান প্রতিবেশীরাও। তারপর আবার পরের দিনের প্রস্তুতি। ফোন চার্জ দিতে পাঠাতে হয় আলাদা কেন্দ্রে। বিদ্যুতের অভাব এখন নিত্যসঙ্গী। তবু স্বপ্ন দেখা থামাননি ডানা।
তিনি নেতা হতে চান, সমাজের জন্য কাজ করতে চান, নতুন ভাষা শিখতে চান। আর সবচেয়ে বড় কথা, তিনি চান তার মা যেন ওপর থেকে দেখে বলতে পারেন— যুদ্ধ সবকিছু কেড়ে নিতে পারেনি, মেয়ের স্বপ্নটুকু এখনো বেঁচে আছে।
অনুবাদ: রুবাইয়া জেসমিন, কলকাতা প্রতিনিধি




