সীমান্ত নেই, ভূখণ্ড-বিরোধও নেই
ইসরায়েলকে কেন ‘মুছে দিতে’ চায় ইরান?
- ১৯৭৯-এর ইসলামি বিপ্লব থেকে ‘২০৪০’-এর কাউন্টডাউন
- ফিলিস্তিন থেকে আমেরিকাবিরোধিতা: তেহরানের ইসরায়েলনীতি শুধু ভূরাজনীতি নয়

শত্রুতা এখন আর ছায়াযুদ্ধেও আটকে নেই, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের সরাসরি সংঘাত দুই দেশকে প্রকাশ্য যুদ্ধের কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে অভিন্ন সীমান্ত নেই। সরাসরি কোনো ভূখণ্ড নিয়েও বিরোধ নেই। অথচ প্রায় পাঁচ দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গভীর রাষ্ট্রীয় বৈরিতার এক পাশে ইরান, অন্য পাশে ইসরায়েল। সেই শত্রুতা এখন আর ছায়াযুদ্ধেও আটকে নেই, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের সরাসরি সংঘাত দুই দেশকে প্রকাশ্য যুদ্ধের কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছে। প্রশ্ন তাই নতুন করে উঠছে, ইসরায়েলবিরোধিতা ইরানের কাছে শুধু ফিলিস্তিনের প্রশ্ন, নাকি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও আঞ্চলিক ক্ষমতার রাজনীতিরও অংশ?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ‘মিডল ইস্ট কোয়ার্টারলি’-তে প্রকাশিত ইয়োসি মানশারফের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে ইরানের নীতিকে মূলত ইসরায়েল ‘ধ্বংসের আকাঙ্ক্ষা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু সেই ব্যাখ্যার একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। লেখাটি যে প্রতিষ্ঠান প্রকাশ করেছে, সেই মিডল ইস্ট ফোরাম নিজেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও পশ্চিমা কৌশলগত স্বার্থের পক্ষে কাজ করার কথা জানায়। লেখকও জেরুজালেমভিত্তিক মিসগাভ ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড জায়োনিস্ট স্ট্র্যাটেজির গবেষক। ফলে ইরান কেন ইসরায়েলের বিরোধিতা করে, তা বুঝতে শুধু এই একটি দৃষ্টিকোণ নয়, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দীর্ঘ দখল, বসতি সম্প্রসারণ, গাজায় সামরিক অভিযান এবং তেহরানের নিজের ব্যাখ্যাও পাশাপাশি দেখা প্রয়োজন।
‘ইসরায়েল বিলুপ্তি’ বলতে কী বোঝায় তেহরান
ইরানের বক্তব্যের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশটি এখানেই। ২০১৫ সালে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছিলেন, ইসরায়েল আগামী ২৫ বছর টিকবে না। পরে তেহরানে ২০৪০ সালকে সামনে রেখে একটি ‘কাউন্টডাউন’ ঘড়িও স্থাপন করা হয়। এই ভাষা ইসরায়েলে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখা হয়েছে এবং মানশারফও তার নিবন্ধে এটিকেই ইরানের নীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে তুলে ধরেছেন।
তবে তেহরান বারবার দাবি করেছে, ‘ইসরায়েল বিলুপ্তি’ বলতে তারা ইহুদি জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার কথা বলছে না। ২০১৯ সালে খামেনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ইহুদিদের নির্মূল করা তাদের লক্ষ্য নয়; বরং মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদিসহ ফিলিস্তিনের মানুষের ভোটের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণের পক্ষে ইরান। অর্থাৎ ইরানের সরকারি ব্যাখ্যায় বিরোধটি ইহুদি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নয়, বর্তমান ইসরায়েলি রাষ্ট্রকাঠামো ও জায়নবাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ‘ইসরায়েলকে ধ্বংস’ করার ভাষা নিঃসন্দেহে উত্তেজক এবং বহু ইরানি কর্মকর্তার বক্তব্যে ইহুদিবিরোধী উপাদানও সমালোচিত হয়েছে। কিন্তু ইরানের সম্পূর্ণ অবস্থানকে শুধু জাতিগত বা ধর্মীয় ঘৃণা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে তেহরান যে ফিলিস্তিনি আত্মনিয়ন্ত্রণ, দখল এবং বাস্তুচ্যুতির প্রশ্ন সামনে আনে, সেই অংশটি হারিয়ে যায়।
যে দখলের কথা বিশ্লেষণে প্রায় অনুপস্থিত
ইরানের ইসরায়েলবিরোধিতার পক্ষে তেহরানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক যুক্তি ফিলিস্তিন।
১৯৬৭ সাল থেকে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি দখল এবং সেখানে বসতি সম্প্রসারণ আন্তর্জাতিক আইনে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৩৩৪ নাম্বার প্রস্তাবে স্পষ্ট বলা হয়েছে, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে, পূর্ব জেরুজালেমসহ, ইসরায়েলি বসতির কোনো আইনগত বৈধতা নেই এবং তা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ২০২৬ সালের জুনে জাতিসংঘ মহাসচিবের সর্বশেষ প্রতিবেদনেও সেই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
আরও কঠোর অবস্থান এসেছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত থেকে। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দেওয়া পরামর্শমূলক মতামতে আদালত জানায়, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অব্যাহত উপস্থিতি বেআইনি। আদালতের মতে, ইসরায়েলকে যত দ্রুত সম্ভব সেই উপস্থিতির অবসান ঘটাতে হবে, নতুন বসতি নির্মাণ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং অধিকৃত ভূখণ্ড থেকে বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে নিতে হবে।
তাই তেহরানের ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানকে শুধুই ‘অকারণ শত্রুতা’ হিসেবে তুলে ধরলে এই আন্তর্জাতিক আইনি প্রেক্ষাপট আড়ালে পড়ে যায়। ইরানের যুক্তি হলো, যে রাষ্ট্র ফিলিস্তিনি ভূমির ওপর দীর্ঘস্থায়ী দখল বজায় রেখেছে এবং যে দখলকে বিশ্বের সর্বোচ্চ আদালতও বেআইনি বলেছে, তার বিরুদ্ধে ‘প্রতিরোধ’কে শুধু দুই রাষ্ট্রের ব্যক্তিগত বৈরিতা হিসেবে দেখা যায় না।
১৯৭৯-এ সম্পর্ক বদলের নেপথ্যে ফিলিস্তিন
অবশ্য ১৯৭৯ সালের আগে ছবিটা একেবারেই অন্যরকম ছিল। শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির আমলে ইরান ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিল। ইসলামি বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি সেই নীতি পুরোপুরি বদলে দিয়েছিলেন।
নতুন ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইসরায়েলের স্বীকৃতি প্রত্যাহার করে এবং তেহরানে ইসরায়েলি দূতাবাস ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেয়। খোমেনি রমজানের শেষ শুক্রবারকে ‘কুদস দিবস’ ঘোষণা করেন জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনকে মুসলিম বিশ্বের যৌথ রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে সামনে আনার জন্য। মানশারফ এই সিদ্ধান্তকে ইসলামি বিপ্লব ‘রপ্তানি’ এবং আঞ্চলিক প্রভাব তৈরির কৌশল হিসেবে দেখেছেন।
কিন্তু তেহরানের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, আরব সরকারগুলোর একটি অংশ যখন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে শুরু করে, তখনো ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র, ভূমি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জিত হয়নি। সে কারণেই ইরান নিজেকে ‘ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের সমর্থক’ হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে।
‘প্রতিরোধ অক্ষ’: প্রভাব বিস্তার, না ইসরায়েলকে ঠেকানোর কৌশল?
এই নীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস ও ইসলামিক জিহাদ এবং অঞ্চলের আরও কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি ইরানের সমর্থন।
মানশারফের যুক্তি, এসব গোষ্ঠীকে সহায়তা করে ইরান নিজের প্রভাব আরব বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে এবং ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ গড়ে আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে।
তেহরানের বক্তব্য অবশ্য উল্টো। ইরান বলেছে, ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সমর্থনের বিপরীতে ফিলিস্তিনি ও লেবাননি প্রতিরোধকে সহায়তা করা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য তৈরির উপায়। এমনকি তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত মাসুদ পেজেশকিয়ানও ২০২৪ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর জানিয়েছিলেন, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের নীতির মোকাবিলায় ‘প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর’ প্রতি ইরানের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।
অবশ্য হামাসের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় বেসামরিক মানুষ হত্যা ও জিম্মি করার ঘটনা কিংবা যেকোনো পক্ষের বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রশ্ন তোলে। ‘প্রতিরোধ’ শব্দ ব্যবহার করলেই সেই আইনি দায় মুছে যায় না। একইভাবে ইসরায়েলের নিরাপত্তার যুক্তিও অধিকৃত ভূখণ্ড স্থায়ীভাবে দখলে রাখা বা অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের বৈধতা দেয় না৷ আন্তর্জাতিক বিচার আদালতও নিরাপত্তার উদ্বেগকে ভূখণ্ড অধিগ্রহণের নিষেধাজ্ঞার ওপরে স্থান দেয়নি।
আমেরিকা কেন এই শত্রুতার কেন্দ্রে
ইরানের দৃষ্টিতে ইসরায়েল প্রশ্নটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা নয় ৷ ১৯৫৩ সালে ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করার অভ্যুত্থানে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের ভূমিকা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক স্মৃতিতে এখনো গভীর। শাহের শাসনের প্রতি ওয়াশিংটনের দীর্ঘ সমর্থনও সেই ক্ষোভের অংশ। ফলে খোমেনি ও খামেনির রাজনৈতিক দর্শনে যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা আধিপত্যের কেন্দ্র এবং ইসরায়েলকে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মিত্র হিসেবে দেখা হয়েছে। মানশারফের গবেষণাতেও এই ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী’ দৃষ্টিভঙ্গিকে ইরানের ইসরায়েলনীতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই যুক্তি ২০২৬ সালে আরও তীব্র হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর তেহরানের কাছে দুই দেশকে আলাদা প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার সুযোগ আরও কমেছে। অর্থাৎ ইরানের চোখে যে ইসরায়েল এতদিন মার্কিন শক্তির আঞ্চলিক অংশীদার ছিল, এবার সেই দুই দেশ সরাসরি একই সামরিক অভিযানের অংশ হয়েছে।
পরমাণু অস্ত্রের ভয়, প্রমাণ কোথায়?
ইসরায়েল ইরানকে নিজের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখানোর অন্যতম কারণ তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বহুবার দাবি করেছেন, ইরান পরমাণু অস্ত্রের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে এবং তা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে।
কিন্তু প্রকাশ্য আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন এতটা নিশ্চিত নয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা এবং মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে এখনো এমন প্রকাশ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে ইরান বর্তমানে একটি সক্রিয় ও কাঠামোবদ্ধ পরমাণু অস্ত্র তৈরির কর্মসূচি চালাচ্ছে। ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে যা গভীর উদ্বেগের বিষয় এবং অস্ত্রমানের প্রায় ৯০ শতাংশের তুলনায় প্রযুক্তিগতভাবে কাছাকাছি। কিন্তু উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা আর কার্যকর পরমাণু বোমা তৈরি করা এক জিনিস নয়।
তেহরান বরাবরই বলেছে, তার কর্মসূচি বেসামরিক এবং পরমাণু অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়নি। অন্যদিকে পরিদর্শনে সীমাবদ্ধতা ও উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম মজুদ আন্তর্জাতিক উদ্বেগ জিইয়ে রেখেছে। ফলে এই প্রশ্নে ইরানের বক্তব্যকে বিনা প্রশ্নে গ্রহণ করার যেমন সুযোগ নেই, তেমনি ‘ইরান বোমা বানাচ্ছে’, এটিকেও প্রমাণিত সত্য হিসেবে লেখা সঠিক নয়।
ইহুদিবিরোধিতা আর ইসরায়েলবিরোধিতা এক নয়
মানশারফের নিবন্ধের একটি বড় অংশ ইরানি রাষ্ট্রীয় চিন্তায় ইহুদিবিরোধিতার অভিযোগ নিয়ে। ইরানের কিছু নেতা ও রাষ্ট্রীয় প্রচারে নিঃসন্দেহে এমন বক্তব্য পাওয়া গেছে, যা ইহুদিবিরোধী বলে সমালোচিত হয়েছে। সেই ইতিহাস উপেক্ষা করা যায় না।
কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইরান বলে এসেছে, তাদের বিরোধিতা ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে নয়। ইরানে এখনো একটি ঐতিহাসিক ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করে এবং তাদের পার্লামেন্টে সংরক্ষিত প্রতিনিধিত্বও রয়েছে। খামেনির ২০১৯ সালের বক্তব্যেও মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি–তিন সম্প্রদায়কেই প্রস্তাবিত ফিলিস্তিনি গণভোটের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
সুতরাং ইসরায়েলি রাষ্ট্রনীতি বা জায়নবাদের বিরোধিতা এবং ইহুদি মানুষের প্রতি বিদ্বেষকে এক করে দেখা সংবাদগতভাবেও সমস্যাজনক। তবে রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষা যখন ধর্মীয় বা জাতিগত ঘৃণায় পরিণত হয়, তখন সেই সীমারেখাও স্পষ্ট রাখা জরুরি।
মোজতবার সামনে পুরনো প্রশ্ন
আলি খামেনির মৃত্যুর পর মোজতবা খামেনির হাতে ইরানের নেতৃত্ব গেলেও ইসরায়েল প্রশ্নে এখন পর্যন্ত মৌলিক পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত নেই। মানশারফের পূর্বাভাস, নতুন নেতৃত্ব প্রথমে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক শক্তি পুনর্গঠন করবে, ‘প্রতিরোধ অক্ষ’কে আবার শক্তিশালী করবে এবং সুযোগ পেলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পুরনো কৌশলেই ফিরবে। তবে এটি লেখকের বিশ্লেষণ–মোজতবা খামেনির ঘোষিত কোনো নীতিপত্র নয়।
বরং বর্তমান যুদ্ধের পর তেহরান তার ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানকে আরও সহজে ‘আত্মরক্ষা’ ও ‘ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ’-এর ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারছে। কারণ ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল এখন শুধু গোপন অভিযান বা প্রক্সি সংঘাতের প্রতিপক্ষ নয়; সরাসরি সামরিক আঘাতকারী দেশ।
ফলে ইরান-ইসরায়েল বৈরিতাকে বোঝার জন্য ‘ইরান কেন এমন একটি দেশকে ধ্বংস করতে চায়, যার সঙ্গে তার সীমান্তবিরোধ নেই’, এই প্রশ্নটি একা যথেষ্ট নয়। পাল্টা প্রশ্নও রয়েছে: ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে দীর্ঘ দখল, আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ বসতি এবং দশকের পর দশক ধরে চলা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রহীনতার মধ্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক প্রতিরোধ কেন তৈরি হয়েছে?
ইরানের নীতির মধ্যে নিঃসন্দেহে ধর্ম, বিপ্লবী আদর্শ, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক প্রভাবের হিসাব রয়েছে। কিন্তু ফিলিস্তিন প্রশ্নকে নিছক সেই ক্ষমতার খেলায় নামিয়ে আনলেও বাস্তবতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় এবং জাতিসংঘের অবস্থানই দেখায়, ইসরায়েলি দখল ও বসতি নিয়ে যে অভিযোগ তেহরান তোলে, তার সবটুকু রাজনৈতিক প্রচারণা নয়; এর একটি সুস্পষ্ট আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তিও রয়েছে।
মানচিত্রে ইরান ও ইসরায়েলের মাঝখানে রয়েছে একাধিক দেশ, কিন্তু রাজনীতির মানচিত্রে ব্যবধানটি যেন ক্রমেই ছোট হয়েছে। একসময় যে যুদ্ধ চলত প্রক্সি, স্লোগান আর গোপন অভিযানে, তা এখন সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্রের ভাষায় কথা বলছে। নেতৃত্ব বদলেছে, যুদ্ধের ধরন বদলেছে কিন্তু তেহরান ও জেরুজালেমের মধ্যে চার দশকে জমে ওঠা সেই শত্রুতার মূল প্রশ্নটি এখনো বদলায়নি।






