হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা যদি কখনো শেষ না হয় তাহলে কী হবে?

সংঘাতের পর থেকে হরমুজ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে ইরানের সামরিক বাহিনী। ফাইল ছবি
কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন দেশের সরকার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং আর্থিক সংস্থাগুলো হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থাকে একটি অস্থায়ী সংকট হিসেবে বিবেচনা করে আসছিল। সবার আশা ছিল, তেহরান ও ওয়াশিংটন অবশেষে কূটনীতি বা সামরিক উত্তেজনা হ্রাসের মাধ্যমে প্রণালির সংকট সমাধান হয়ে যাবে।
তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ঋণমাণ নিয়ে কাজ করা মুডিস রেটিংস বলছে ভিন্ন কথা। তারা সতর্ক করেছে, বিশ্বকে হয়তো অন্যভাবে চিন্তা করতে হবে।
নতুন এক প্রতিবেদনে রেটিং সংস্থাটি বলেছে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুটের সংকট এখন আর স্বল্পমেয়াদী বলে মনে হচ্ছে না। বরং এটি ২০২৬ সালের পরেও বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে নতুন রূপ দিতে পারে।
মুডিস দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হবার পূর্বাভাস দিচ্ছে।
বিশ্বের জন্য প্রণালিটি এখনও গুরুত্বপূর্ণ, কেননা হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবারহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হয়। এ জলপথে যুদ্ধ বিশ্ববাণিজ্যে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।
এতে বীমা কোম্পানিগুলো প্রিমিয়াম বাড়িয়েছে এবং জাহাজ কোম্পানিগুলো এলাকাটি এড়িয়ে চলছে। এই পথে জাহাজ চলাচল সংঘাত-পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় ৯০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো, এই অচলাবস্থা যদি মাসের পর মাস চলতে থাকে তাহলে কী হবে।
এর ফলে স্থায়ীভাবে জাহাজে খরচ বাড়বে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাবে, বাণিজ্য চলাচল কমবে এবং নতুন সরবরাহ কৌশল গ্রহণ করতে হতে পারে।
মুডিস বলেছে, কোম্পানি ও সরকারগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেবে।
মুডিস এখন মনে করছে, এ বছরের বেশিরভাগ সময় ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ থেকে ১১০ ডলারের মধ্যে থাকবে, যা প্রত্যাশার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
ভোক্তাদের জন্য এর অর্থ হতে পারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, বিমান ভাড়া ও পরিবহন খরচ বাড়া এবং মুদ্রাস্ফীতির ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ। এর ফলে, উৎপাদন খরচ বাড়াবে এবং ক্রয়ক্ষমতাকে কমিয়ে ফেলবে।
সংস্থাটি সতর্ক করেছে, যুদ্ধবিরতি বা রাজনৈতিক চুক্তি হলেও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে অনেক সময় লাগবে। কারণ জাহাজ চলাচলের জট, ট্যাংকারের অবস্থান পরিবর্তন এবং বীমা ব্যবস্থা স্থিতিশীল হতে কয়েক মাস সময় লাগবে।
যেসব শিল্প জ্বালানি ও পরিবহনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং তেলের উচ্চমূল্য অব্যাহত থাকলে সেগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে পরিবারগুলো খরচ কমিয়ে দিলে খুচরা, আতিথেয়তা এবং উৎপাদনসহ ভোক্তা খাতগুলোও চাপের মুখে পড়তে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরের জ্বালানি উৎপাদক এবং মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলো তেলের উচ্চমূল্য এবং বর্ধিত ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা থেকে লাভবান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে এশীয় দেশগুলোর অর্থনীতি সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে।
ভারতকে অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ প্রধান অর্থনীতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ এর অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৪৬ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে।
বিশাল জরুরি মজুদ থাকা সত্ত্বেও জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকেও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত মূল্য নির্ধারণ এবং বিপুল মজুত থাকা সত্ত্বেও চীন তার শিল্পখাতের মুনাফার ওপর চাপের সম্মুখীন হতে পারে।
মুডিস বলেছে, ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০-১১০ ডলারে স্থির থাকলে তাদের অনুমান অনুযায়ী, বেশ কয়েকটি প্রধান অর্থনীতির প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০.২-০.৮ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে যাবে।
সম্ভবত মুডিসের প্রতিবেদনের সবচেয়ে বড় বার্তাটি হলো, বিশ্ব অর্থনীতি হয়তো আর হরমুজ প্রণালির সংকট দ্রুত শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে না।
এর পরিবর্তে, সরকার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বিনিয়োগকারীরা ক্রমবর্ধমানভাবে এমন সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্য পথে অনিশ্চয়তা চলতে থাকবে এবং বিশ্ব হয়তো এতে মানিয়ে নিবে।
সূত্র : গালফ নিউজ




