বিড়াল না কুকুর, পূর্ব এশিয়ায় কোন প্রাণীর জনপ্রিয়তা বেশি

চীনের গুয়াংসি ঝুয়াং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের নাননিংয়ে ২০২৫ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত গ্র্যান্ডিউর ওয়ার্ল্ড পেট ফেয়ারের প্রদর্শনীতে এক দর্শনার্থী কুকুর নিয়ে বিড়াল দেখছেন
বিড়াল নাকি কুকুর, মানুষ কোন প্রাণীটিকে বেশি পছন্দ করেন। এ নিয়ে বিতর্ক বহু পুরনো। তবে পূর্ব এশিয়ায় এখন যেন পাল্লা ভারী হচ্ছে বিড়ালের দিকেই। তাইওয়ান, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও হংকংসহ বিভিন্ন দেশে দ্রুত বাড়ছে পোষা বিড়ালের সংখ্যা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগরজীবনের চাপ, একাকীত্ব, ছোট বাসস্থান ও কমে যাওয়া জন্মহারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বিড়াল প্রেমের।
তাইওয়ানের সরকারি এক জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে প্রথমবারের মতো পোষা কুকুরের চেয়ে সংখ্যা বেশি হয়েছে বিড়ালের। ২০২৩ সালে যেখানে পোষা বিড়ালের সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ। সেখানে ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখে। এক বছরে বৃদ্ধি প্রায় ৩৩ শতাংশ।
২০২১ সালে একই প্রবণতা দেখা যায় চীনের মূল ভূখণ্ডেও। আর জাপানে প্রায় এক দশক আগেই জনপ্রিয়তায় কুকুরকে ছাড়িয়ে যায় বিড়াল। দক্ষিণ কোরিয়া ও হংকংয়ে এখনও কুকুরের সংখ্যা বেশি হলেও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বিড়াল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্ব এশিয়ার বড় শহরগুলোতে মানুষের জীবনযাত্রার ধরন বদলে যাওয়াই এ পরিবর্তনের বড় কারণ। অধিকাংশ মানুষ বসবাস করেন ছোট অ্যাপার্টমেন্টে। তারা দীর্ঘ সময় কাজ করেন এবং একাকীত্বে ভোগেন। ফলে তুলনামূলক কম যত্নে পালন করা যায় বলে বিড়ালের প্রতি ঝুঁকছেন অনেকে।
হংকংয়ের বাসিন্দা এলেন চুং সিএনএনকে বলেছেন, শহুরে জীবনে বিড়াল পালন বেশি সুবিধাজনক। কুকুরকে নিয়মিত বাইরে হাঁটাতে নিতে হয়, যা ব্যস্ত মানুষের জন্য কঠিন। অনেকেই আবার কুকুরকে ভয়ও পান।
তার ভাষ্য, বিড়াল দেখতে আরও আকর্ষণীয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে কারণগুলো মানুষকে বিড়ালের দিকে টানছে, সেগুলোই জন্মহার কমার পেছনেও ভূমিকা রাখছে।
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী পল ওংয়ের মতে, এখন সন্তান নিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক মানুষ। ফলে অনেকের কাছে পোষা প্রাণী যেন সন্তানের বিকল্প হয়ে উঠছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় আগে অশুভ বা দুর্ভাগ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো বিড়ালকে। তবে করোনা মহামারির পর বদলাতে শুরু করেছে সে ধারণা। ঘরে বসেই সহজে যত্ন নেওয়া যায় বলে এখন বিড়াল পোষার দিকে ঝুঁকছেন অনেকেই।
দক্ষিণ কোরিয়ার হোয়াসং শহরের একটি বিড়াল দত্তক কেন্দ্রের চিকিৎসক গং সু-হিউন জানিয়েছেন, আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি মানুষ বিড়াল দত্তক নিতে ও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে আসছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্ব এশিয়ার সমাজে প্রাণীদের ভূমিকা নিয়েও মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। আগে কুকুর ব্যবহার হতো নিরাপত্তার কাজে, আর বিড়াল রাখা হতো ইঁদুর দমনের জন্য। এখন প্রাণীগুলোকে একাকীত্ব কাটানোর সঙ্গী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একই সময়ে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় কমছে বিয়ে ও সন্তান জন্মহার। জাপানের জনসংখ্যা টানা ১৬ বছর ধরে কমছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় বিশ্বের সবচেয়ে কম জন্মহার রেকর্ড করা হয়েছে। শহুরে জীবনের ব্যয়বহুল বাস্তবতা, চাকরির প্রতিযোগিতা ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টাকে এর জন্য দায়ী করছেন গবেষকরা।
হংকং শু ইয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জো নগাইয়ের মতে, বিড়াল ছোট বাসায় সহজে মানিয়ে নিতে পারে এবং বাইরে নিয়ে যেতে হয় না। ফলে ব্যস্ত নগরজীবনের সঙ্গে এটি বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
একাকীত্বও বড় একটি কারণ হয়ে উঠেছে। জাপানে দীর্ঘ সময় নিজেকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার প্রবণতা ‘হিকিকোমোরি’ নামে পরিচিত। দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে একাকীত্ব মোকাবিলায় পাঁচ বছর মেয়াদি বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চীনে জনপ্রিয় হয়েছে ‘আর ইউ ডেড’ নামে একটি অ্যাপ। যেখানে ব্যবহারকারীদের প্রতিদিন নিজের উপস্থিতি জানাতে হয়।
মানুষের এই পরিবর্তিত জীবনযাত্রার প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতেও। গোল্ডম্যান স্যাকসের ২০২৪ সালের এক গবেষণা বলছে, চীনে দ্রুত বাড়ছে পোষা প্রাণীর খাবারের বাজার। ২০৩০ সালে এর বাজারমূল্য পৌঁছাতে পারে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো শিশুর স্ট্রলারের চেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে পোষা প্রাণীর স্ট্রলার।
মনোবিজ্ঞানী পল ওংয়ের মতে, মানুষ যদি পোষা প্রাণীর মাধ্যমে মানসিক স্বস্তি পায়। তাহলে কম জনসংখ্যার সমাজ হলেও সেটি হয়তো বিষণ্ন সমাজের চেয়ে ভালো।
সূত্র: সিএনএন








