প্রাণহীন গাজায় শুধু হাড়ের স্তূপ
- ইসরায়েলের হামলার ১০০০ দিন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গাজা! ধু-ধু মরুভূমির বুকে মধ্যপ্রাচ্যের অসহায় একফালি ভূখণ্ড। ৩৬৫ বর্গকিলোমিটারের চিলতে মানচিত্র। কেউ ডাকে ‘অবরুদ্ধ গাজা’। কারও কাছে ‘পৃথিবীর উন্মুক্ত কারাগার’। কত নাম ফিলিস্তিনের এই ‘শিকলঘেরা’ ভূমিটুকুর! গোলাবারুদের নিষ্ঠুর কলমে নতুন আরেকটি নাম লিখেছে ইসরায়েল— ‘পৃথিবীর বধ্যভূমি। সবচেয়ে বড় কবরস্থান।’ মাত্র এক হাজার দিনেই ভূপৃষ্ঠের সবচেয়ে ‘বড় মর্গে’ পরিণত করেছে মধ্যপ্রাচ্যের রক্তপিপাসু দানব ইসরায়েল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ২ জুলাই। দীর্ঘ এই সময়ে আধুনিক ইতিহাসের বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে ইসরায়েল। দিনে দিনে মৃত্যুপুরী বানিয়ে ফেলেছে। দিনদুপুরে; পুরো দুনিয়ার সামনে! বিশ্বমানবতার সামনে! সব হারিয়েছে গাজা— সন্তান, সম্পদ, সীমানা... সব! তিন বছর আগের সেই উচ্ছল প্রাণবন্ত গাজা আর নেই। বুকের জমিতে হেসেখেলে বেড়ানো হাজার হাজার প্রাণ হারিয়ে ‘হাড়ের স্তূপ’ হয়ে বসে আছে সাগরপাড়ের (ভূমধ্যসাগর) এ নীলকণ্ঠী নগরী। ইসরায়েলের টন টন বোমায় কঙ্কাল হয়ে পড়ে আছে জৌলুশ হারিয়ে। খোলা আকাশের নিচে এক বিরান ধ্বংসস্তূপ। ডানে-বামে, সামনে-পেছনে; যতদূর চোখ যায় শুধু ইট-পাথরের জঞ্জাল! ধ্বংসের ভাগাড়!
ইসরায়েলি বর্বরতার ১০০০ দিনের পূর্তিতে বৃহস্পতিবার দুর্ভাগা জনপদের সেই বেহাল চিত্রই তুলে ধরেছে হামাস নিয়ন্ত্রিত ‘গাজা মিডিয়া অফিস’। বলেছে, ‘পুরো গাজা আজ মানুষের হাড়ের স্তূপ— কংক্রিটের কঙ্কাল ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই আর।’ এদিনের সর্বশেষ হিসাব বলছে, ইসরায়েলের বিরামহীন হামলায় প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৭৩ হাজার ৬৬ জন ফিলিস্তিনি। যার মধ্যে ২১ হাজার ৫০০-এর বেশি শিশু। ধ্বংসস্তূপের নিচে চিরতরে নিখোঁজ হয়ে আছে আরও সাড়ে ৯ হাজার মানুষ। আহত হয়ে পড়ে আছে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৪ জন, যার মধ্যে ৪৩৩ জন সাংবাদিক। বিকলাঙ্গ প্রায় ৪৩ হাজার। এখানেই শেষ নয়, ইসরায়েলের ২ লাখ ২৩ হাজার টনের বেশি বিস্ফোরকে ধুলোয় মিশে গেছে অসহায় জনপদের ৯০ শতাংশ ঘরবাড়ি। আনুমানিক ৬ কোটি ৮০ লাখ টন ইট-পাথরের ধ্বংসস্তূপ। মিসরের ১১টি সুউচ্চ পিরামিডের সমান। ১৪০ বছরেরও বেশি সময় লাগবে এ ধ্বংসের পাহাড় সরাতে। মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে হাসপাতাল ও বিদ্যালয়। সব মিলে ৮০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে গাজা, যার মধ্যে আবাসন খাতেই ৩৪ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দখল করে নিয়েছে ৮০ শতাংশেরও বেশি ভূখণ্ড। বেঁচে থাকা ২০ লাখ মানুষ আজ নিজ ভূমিতেই উদ্বাস্তু হয়ে তাঁবুতে অনাহারে, চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। এক হাজার দিন পর গাজা আজ শুধুই এক ভুতুড়ে, প্রাণহীন নিথর উপত্যকা। ২ হাজার ৭০০টিরও বেশি পরিবার চিরতরে মুছে গেছে পৃথিবীর বুক থেকে।
দুই বছরের মাথায়; ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা হওয়া যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় হামাস-ইসরায়েল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘শান্তি বোর্ড’। উদ্দেশ্য গাজা পুনর্গঠন। অর্থাৎ, ট্রাম্প জামাতা জ্যারেড কুশনারের রিয়েল স্টেট ব্যবসার জাদুমন্ত্রে নব-নগরায়ণের চমক। ‘মন্দের ভালো’ সে উদ্যোগও এখন হিমাগারে। হামাসের নিরস্ত্রীকরণ অজুহাতে থমকে গেছে বাস্তবায়নের পরবর্তী সব ধাপও।
যুদ্ধবিরতি তদারকির দায়িত্বে থাকা কূটনীতিক নিকোলাই ম্লাদেনভ বলেছেন, এ ইস্যুতেই অগ্রগতি থেমে আছে। গাজার পুনর্গঠনকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে গঠিত ‘শান্তি বোর্ড’ শুরুতে বড় ঘোষণা ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পেয়েছিল। কিন্তু এখন বোর্ড খুব কমই প্রকাশ্যে কথা বলছে।
হামাস নিরস্ত্রীকরণ হলে গাজায় নতুন প্রশাসন, আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন এবং পুনর্গঠনের পথ খুলতে পারে। তবে হামাস সরাসরি নিরস্ত্রীকরণ প্রত্যাখ্যান না করলেও কিছু অস্ত্র ধরে রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে এবং ইসরায়েলের কাছ থেকে আরও ছাড় চেয়েছে।
শোকে বিভাজনে ইসরায়েল: গত ১০০০ দিনে ইসরায়েলিরাও ৭ অক্টোবরের হামলার আঘাত বহন করছে। নেগেভ মরুভূমির নোভা মিউজিক ফেস্টিভ্যালের সেই ভয়ংকর দিন। মনে পড়লেই আঁতকে ওঠে এখনো।
বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থানে নিহতদের স্মরণ করা হয়। নোভা সংগীত উৎসবস্থলও ছিল স্মরণ অনুষ্ঠানের একটি কেন্দ্র, যেখানে অন্তত ৩৬৪ জন নিহত এবং ৪০ জন জিম্মি হয়েছিলেন।
ধ্বংসস্তূপে গাজা, সহায়তায় বাধা: গাজাবাসী বলছে, তারা সহ্যসীমার শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে। কেউ বিশাল তাঁবু শিবিরে, কেউ বোমায় বিধ্বস্ত ভবনের কাঠামোর মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে। মাথার ওপর ইসরায়েলি ড্রোনের শব্দ আর প্রতিদিন হামলার আশঙ্কা— এ বাস্তবতার মধ্যেই চলছে তাদের জীবন।
গাজার বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। খান ইউনিসের ৩৩ বছর বয়সী দোকানি মাহমুদ আশুর জানিয়েছেন, যুদ্ধের আগে তাদের সবকিছু ছিল। এখন শুধুই এক কামড় খাবারের জন্য অপেক্ষা।




