মেক্সিকোতে এআই দিয়েও নকল ঠেকাতে না পেরে পরীক্ষা বাতিল

সংগৃহীত ছবি
নকল ঠেকাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরীক্ষার্থীর পরিচয় নিশ্চিত করতে ব্যবহার করা হয় ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং বিশেষ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। কিন্তু ফল প্রকাশের পর অস্বাভাবিকভাবে বেশি নম্বর পাওয়ার ঘটনা সামনে আসায় মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় ও মর্যাদাপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটি অব মেক্সিকো (ইউএনএএম) প্রায় ৫৮ হাজার শিক্ষার্থীর ভর্তি পরীক্ষার ফল বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
চলতি বছর প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়টি স্নাতক পর্যায়ের ভর্তি পরীক্ষা পুরোপুরি অনলাইনে আয়োজন করে। মে ও জুনে অনুষ্ঠিত ওই পরীক্ষায় অংশ নেন প্রায় এক লাখ ৫৮ হাজার শিক্ষার্থী। বাসা থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের নকল ঠেকাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি, মুখ শনাক্তকরণ, মাইক্রোফোন পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষার সময় কম্পিউটারে অন্য কোনো পাতা খোলা ঠেকানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
অস্বাভাবিক ফলেই সন্দেহ
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২০ নম্বরের ভর্তি পরীক্ষায় সাধারণত ১০০ বা তার বেশি নম্বর পান মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ। কিন্তু এবার সেই হার বেড়ে ১৬ শতাংশেরও বেশি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় অস্বাভাবিকতা দেখা গেছে চিকিৎসাবিদ্যায় ভর্তি পরীক্ষায়। গত বছর যেখানে ১০০-এর বেশি নম্বর পেয়েছিলেন প্রায় ৯ শতাংশ পরীক্ষার্থী, সেখানে এবার সেই হার প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। আইন, বিজ্ঞানসহ আরও কয়েকটি জনপ্রিয় বিভাগেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।
ফল প্রকাশের পরই অনিয়মের নানা অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে অন্য কাউকে দিয়ে পরীক্ষা দেওয়ানো, ক্যামেরার বাইরে দ্বিতীয় মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার, বাইরের ব্যক্তির সহায়তা নেওয়া এবং প্রশ্ন বা উত্তর অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নকলের কৌশল শেখানো ভিডিও এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে উত্তর তৈরির তথ্যও সামনে আসে। তবে কোন পরীক্ষার্থী কী ধরনের অনিয়ম করেছেন, সে বিষয়ে তদন্ত এখনও শেষ হয়নি।
প্রথম ধাপে নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে তিন হাজারের বেশি পরীক্ষার্থীর ফল বাতিল করা হয়। পরে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে পুরো ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। কয়েকজন বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, মোট পরীক্ষার প্রায় অর্ধেকেও কোনো না কোনো ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে।
ফের পরীক্ষা, সরাসরি কেন্দ্রে
পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রায় ৫৮ হাজার পরীক্ষার্থীকে আবার ভর্তি পরীক্ষায় বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবার পরীক্ষা হবে নির্ধারিত কেন্দ্রে, অনলাইনে নয়।
আগামী ১২ থেকে ১৯ আগস্টের মধ্যে মেক্সিকো সিটি, লেওন, ওয়াহাকা ও তিহুয়ানাসহ কয়েকটি শহরে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষার্থীরা ৭ আগস্ট থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন পোর্টালে নিজেদের কেন্দ্র ও সময়সূচি জানতে পারবেন। নতুন পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতেই ভর্তি চূড়ান্ত করা হবে।
শুধু সন্দেহভাজন পরীক্ষার্থী নয়, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ভর্তির জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম নম্বর বা তার বেশি পাওয়া সব পরীক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। ফলে সৎভাবে ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদেরও আবার পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।
এই সিদ্ধান্তের কারণে নতুন শিক্ষাবর্ষও পিছিয়ে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হবে ৩১ আগস্ট। অন্য শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হবে ১৭ আগস্ট।
ক্ষোভ ও তদন্ত
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর লিওনার্দো লোমেলি সৎভাবে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ভুল স্বীকার করে তা সংশোধন করাই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। শিক্ষা গ্রহণের সুযোগে সমতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া প্রয়োজন হয়েছে।
তবে সিদ্ধান্তে ক্ষোভও দেখা দিয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী প্রশ্ন তুলেছেন, অন্যের অনিয়মের দায়ে কেন সবাইকে আবার পরীক্ষা দিতে হবে। অন্যদিকে অল্পের জন্য বাদ পড়া পরীক্ষার্থীদের দাবি, অনিয়মের কারণে ভর্তির ন্যূনতম নম্বর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তারা বঞ্চিত হয়েছেন। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভও হয়েছে।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল
অনলাইন পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে ছিল মেক্সিকোর প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান টেরিটোরিয়াম লাইফ। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছিল, তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নকল ঠেকাতে সক্ষম।
তবে এই কেলেঙ্কারির পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি নির্ধারিত সময়ের আগেই বাতিল করেছে। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত নিরীক্ষা, চুক্তি প্রদানের প্রক্রিয়া পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউমও সম্ভাব্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তদন্তের পক্ষে মত দিয়েছেন। তদন্তে শুধু শিক্ষার্থীদের অনিয়ম নয়, নজরদারি ব্যবস্থা কোথায় ব্যর্থ হয়েছে, প্রশ্ন ফাঁস হয়েছিল কি না এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের দায় কতটা—সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নকল ঠেকাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভরশীল এই পরীক্ষার ঘটনা প্রযুক্তিনির্ভর মূল্যায়ন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেই সামনে এনে দিয়েছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু পুনঃপরীক্ষা আয়োজন নয়, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের হারানো আস্থাও ফিরিয়ে আনা।






