আগামীর সময়

পাকিস্তানে বিদ্রোহে শক্তি যোগাচ্ছে ‘নারী সুইসাইড বোম্বাররা’

পাকিস্তানে বিদ্রোহে শক্তি যোগাচ্ছে ‘নারী সুইসাইড বোম্বাররা’

সংগৃহীত ছবি

সামরিক পোশাক পরে এবং কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে ইয়াসমা বালুচ ও তার স্বামী ওয়াসিম ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। পাকিস্তানি বিদ্রোহীরা তাদের আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণের ‘শেষ মিশন’ সম্পন্ন করার পর এমন একটি ছবিটি প্রকাশ করে।


বালুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) বিবৃতিতে বলে, তারা শেষ লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার আগে একসঙ্গে দুর্দান্ত দাম্পত্য জীবন কাটিয়েছেন।


এই বিবৃতির সঙ্গে সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া একটি সম্পাদিত ছবি যুক্ত ছিল।


তাৎক্ষণিকভাবে এসব ছবি যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।


বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের সম্পদসমৃদ্ধ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশে নিজেদের আন্দোলনের জনপ্রিয়তা তুলে ধরার জন্য বিদ্রোহীদের প্রচারণার কৌশলের অংশ এটি।


পাকিস্তানে আয়তনে সবচেয়ে বড় কিন্তু সবচেয়ে দরিদ্র প্রদেশ হচ্ছে বেলুচিস্তান। এই প্রদেশে গত বছর বিদ্রোহী হামলার সংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে ওই অঞ্চলে পরিকল্পিত বৃহৎ বিনিয়োগ, বিশেষ করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো পড়েছে ঝুঁকির মুখে।


জাতিগত সমর্থন


পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী বলেন, বিদ্রোহীদের দীর্ঘদিনের লড়াই, যার লক্ষ্য বেশি স্বায়ত্তশাসন এবং আঞ্চলিক সম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বড় অংশ নিশ্চিত করা—সে প্রেক্ষাপটে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ নিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করছে।


‘এটি তাদের জনপ্রিয়তা ও প্রভাব বাড়ায় এবং তাদের সম্প্রদায়ের কাছে বার্তা দেয় যে, এই লড়াই এখন তাদের ঘর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে’, যোগ করেন তালাল।


তিনি আরও জানান, অনলাইনে বিদ্রোহীদের নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে পাকিস্তান সরকার বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে আলোচনা করেছে।


বিএলএ এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি।


সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হামজা শাফাআতের মতে, জানুয়ারিতে সংগঠনটির সবচেয়ে বড় হামলার ঢেউয়ে অংশ নেওয়া ছয় নারীর মধ্যে তিনজন ছিলেন আত্মঘাতী হামলাকারী। ওই হামলায় ৫৮ জন নিহত হয় এবং প্রদেশটি প্রায় অচল হয়ে পড়ে।


এই হামলার আগে সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, বিএলএর মোট পাঁচ নারী আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীর তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া গত কয়েক মাসে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে আরও তিনজন সম্ভাব্য আত্মঘাতী হামলাকারীকে আটক করা হয়েছে।


যদিও কর্তৃপক্ষের জানা মতে, খুব অল্পসংখ্যক নারী বিএলএর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই দলভুক্তি প্রমাণ করে যে জাতিগত বালুচ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংগঠনটির সমর্থন বিস্তৃত হচ্ছে।


সংঘাত পর্যবেক্ষক সংস্থা এসিএলইডির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক পার্ল পান্ড্যা বলেন, এই বিদ্রোহের বিস্তৃত আকর্ষণ এখন পুরুষ-প্রধান উপজাতীয় ও সামন্তপ্রধান নেতৃত্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে সমাজের আরও বিস্তৃত অংশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।


‘প্রাণঘাতী বিদ্রোহী গোষ্ঠী’


সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির বিদ্রোহ ও উগ্রবাদবিষয়ক গবেষক আবদুল বাসিত বলেন, বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় বিএলএ সবচেয়ে সংগঠিত ও প্রাণঘাতী বিদ্রোহী গোষ্ঠী।


তিনি বলেন, সেনা মোতায়েন ও দুর্বলতা চিহ্নিত করতে সংগঠনটি ড্রোন ব্যবহার করছে। এছাড়া ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৪০০-র বেশি যাত্রীবাহী একটি ট্রেন ছিনতাইয়ের সময় তারা স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যবহার করেছিল।


পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মতে, গত বছরের জুনের মধ্যে তারা ২৭২টি মার্কিন নির্মিত রাইফেল এবং ৩৩টি নাইট ভিশন ডিভাইস উদ্ধার করেছে।



সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী জানুয়ারির হামলার আগে রয়টার্সকে বলেন, পাকিস্তানের ভেতরে কার্যরত সন্ত্রাসীদের হাতে আমরা নিয়মিতই এসব অস্ত্র দেখতে পাচ্ছি।


মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।


জানুয়ারিতে এক ডজনেরও বেশি সমন্বিত হামলায় বিদ্রোহীরা হাসপাতাল, সরকারি ভবন ও বাজারে হামলা চালায়, বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় এবং জনতার ওপর গুলি চালায়। এতে ৫৮ জন বেসামরিক মানুষ ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হন।


‘কৌশলে বিপজ্জনক পরিবর্তন’


পরবর্তীতে প্রায় এক সপ্তাহের লড়াইয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি অনুযায়ী নিহত ২১৬ জন জঙ্গির কাছ থেকে গ্রেনেড লঞ্চার থেকে শুরু করে এক ডজনের বেশি এম-১৬ ও এম-৪ রাইফেলসহ বিভিন্ন অস্ত্র জব্দ করা হয়।


বিএলএর হামলায় ব্যবহৃত এসব উন্নত অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি কি না বা অন্য কোথাও থেকে এসেছে কি না—রয়টার্স তা যাচাই করতে পারেনি।


মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে ফেলে যাওয়া প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জামের মধ্যে আফগান বাহিনী মোট ৪ লাখ ২৭ হাজারের বেশি অস্ত্রের মধ্যে ৩ লাখের বেশি অস্ত্র পেয়েছিল। এতে ৪২ হাজারের বেশি সামগ্রী অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে নাইট ভিশন গগলস ও নজরদারি যন্ত্রপাতি।


এদিকে নারী সদস্যদের নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে বালুচ বিদ্রোহীরা তাদের প্রভাব বাড়াতে চায়।


গবেষক আবদুল বাসিত বলেন, দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তারা কৌশলগতভাবে নারীদের ভয়াবহ হামলায় ব্যবহার করছে।
পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী বিভাগের ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব নারী বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক পটভূমি থেকে এসেছে, যাদের মধ্যে কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষিত।


প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ সন্ত্রাসী কৌশলে এক বিপজ্জনক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
এ পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তার, অনলাইন উগ্রপন্থায় দীক্ষা দেওয়া এবং দুর্বল ব্যক্তিদের কৌশলগতভাবে কাজে লাগানো।


এসিএলইডির বিশ্লেষক পান্ড্যা বলেন, এখন বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির সাধারণ সদস্য থেকে শুরু করে নেতা পর্যায়ের সবাই মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে আসছেন।



    শেয়ার করুন: