কলকাতার রেড রোডে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস ঘিরে বিতর্ক

যোগ ব্যায়াম করছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি : সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উপলক্ষে আগামী ২১ জুন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার রেড রোডে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে বৃহৎ কর্মসূচির প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে। সেই অনুষ্ঠানের জন্য ১৪ জুন রাত থেকেই রেড রোডে যান চলাচলে কড়া বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে প্রশাসনের তরফে। কিন্তু এই আয়োজনকে ঘিরেই নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক দানা বেঁধেছে।
বিরোধীদের প্রশ্ন, যে রেড রোডে ঈদের নামাজের অনুমতি দেওয়া হয়নি যানজট ও জনভোগান্তির যুক্তি দেখিয়ে, সেই একই রাস্তায় যোগ দিবসের অনুষ্ঠানের জন্য প্রায় এক সপ্তাহ ধরে যান চলাচল বন্ধ রাখা হল কীভাবে? এই প্রশ্ন তুলে সরব হয়েছেন আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি এবং আমজনতা উন্নয়ন পার্টির (এজেইউপি) নেতা তথা নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। তাদের অভিযোগ, এক ক্ষেত্রে প্রশাসনের কঠোরতা আর অন্য ক্ষেত্রে উদারতা- এই দ্বিচারিতার জবাব সরকারের দেওয়া উচিত।
কেন্দ্রীয় আয়ুর্বেদ মন্ত্রীর উদ্যোগে এ বছর আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের অনুষ্ঠানে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের অংশগ্রহণের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন মহলের দাবি, শহর জুড়ে কয়েক লক্ষ মানুষকে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি প্রশ্ন তুলেছেন, যদি রাস্তায় নামাজ পড়া বা অন্য ধর্মীয় জমায়েত নিয়ে বারবার আপত্তি ওঠে, তাহলে রেড রোডের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় হাজার হাজার মানুষের যোগাভ্যাসের আয়োজনকে ভিন্ন চোখে দেখা হবে কেন। তার বক্তব্য, সরকারি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ডে বিচার করা উচিত।
তিনি আরও প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ঈদের জন্য রেড রোডের নামাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অথচ যোগ দিবসের অনুষ্ঠানের জন্য সেই জায়গাটিই বেছে নেওয়া হল এবং রেড রোড টানা সাত দিন বন্ধ রাখা হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষ রাস্তায় প্রার্থনা করলে তাকে ট্রাফিক জ্যাম বলা হয়, কিন্তু একই রাস্তা বহুদিন বন্ধ রেখে যোগ কর্মসূচি হলে তা নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠে না। এই দ্বিচারিতা কেন?'
তার দাবি, প্রধানমন্ত্রী আসার জন্য সাত দিন রাস্তা বন্ধ রাখার প্রয়োজন নেই। অতীতে ২৬ জানুয়ারির কুচকাওয়াজের মতো বড় অনুষ্ঠানেও সাধারণত এক দিন আগে থেকে বিধিনিষেধ জারি করা হতো। নওশাদের এই মন্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বিজেপি নেতাদের দাবি, যোগ কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং স্বাস্থ্য ও সুস্থতার সঙ্গে যুক্ত একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অনুশীলন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক যোগ দিবস জাতিসংঘ স্বীকৃত একটি কর্মসূচি এবং এর সঙ্গে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের সম্পর্ক নেই।
এই বিতর্কে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে বিধায়ক হুমায়ুন কবীর বলেছেন, একই সরকার দ্বিচারিতার পরিচয় দিচ্ছে। মুসলিমদের দু’ঘণ্টার ঈদের নামাজের ক্ষেত্রে আপত্তি তোলা হচ্ছে, অথচ যোগ দিবসের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রেড রোড কয়েক দিন আগে থেকেই বন্ধ রাখা হয়েছে। মানুষ সবই দেখছে এবং লক্ষ্য করছে।
এদিকে রেড রোডে অনুষ্ঠান ঘিরে জোরকদমে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যেই বিশেষ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা করেছে। নিরাপত্তা, মঞ্চ নির্মাণ, অংশগ্রহণকারীদের বসার ব্যবস্থা এবং অন্যান্য পরিকাঠামোগত কাজের জন্য রেড রোডের একাধিক অংশে যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, এ বছর যোগ ফর হেলদি এজিং বা সুস্থ বার্ধক্যের বার্তাকে সামনে রেখে কর্মসূচি আয়োজন করা হচ্ছে। শহরের বিভিন্ন পার্ক, খোলা মাঠ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি দপ্তরেও যোগাভ্যাসের আয়োজন করা হচ্ছে ২১ জুন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিধানসভা নির্বাচনের পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কলকাতার রেড রোডে জাতীয় স্তরের এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে রাজনৈতিক বার্তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফলে যোগ দিবসের কর্মসূচি ঘিরে স্বাস্থ্যচর্চার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিতর্কও ক্রমশ জোরদার হচ্ছে।




