শপিংয়ে সঙ্গী না থাকলেও ব্যাগ বইবে ‘ভাড়াটে লোক’

সংগৃহীত ছবি
ভাবুন তো, আপনার সঙ্গী ব্যস্ত থাকায় আপনি একা শপিং করতে বের হয়েছেন। দোকান থেকে দোকানে ঘুরছেন, কিন্তু পাঁচ মিনিটের মধ্যেই এক হাতে তিনটি ব্যাগ, অন্য হাতে বেবি স্ট্রলার। অবস্থা এমন মনে হচ্ছে যে কেনাকাটার চেয়ে জিমে ওয়ার্কআউট করাই ছিল সহজ! একটু পরই মনে হলো— ইশ, যদি কেউ পাশে থেকে ব্যাগগুলো বহন করত, পথ দেখাত, কিংবা একটু সাহায্য করত!
দিল্লির এক নতুন স্টার্ট-আপ ঠিক এই সমস্যাকেই পরিণত করেছে ব্যবসায়। ‘ক্যারিমেন’ নামের প্রতিষ্ঠানটি এখন বাজারে আসা ক্রেতাদের জন্য দিচ্ছে ব্যক্তিগত সহকারী। তাদের কাজ—ব্যাগ বহন করা, বেবি স্ট্রলার ঠেলা, ভিড়ের মধ্যে পথ দেখানো, এমনকি প্রয়োজন হলে পানির বোতলও এনে দেওয়া।
এপ্রিল মাসে দিল্লির ব্যস্ত লাজপত নগর মার্কেটে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। নারী ও পুরুষ— দুই ধরনের সহকারীই পাওয়া যাচ্ছে এখানে। মাত্র ৭৯ রুপিতে ৩০ মিনিটের জন্য একজন সহকারী ভাড়া করা যায়। আর এক ঘণ্টার জন্য খরচ ১৪৯ রুপি।
এই ব্যতিক্রমী ধারণার পেছনে রয়েছেন দুই বন্ধু রিতু কান্দারি শ্রীবাস্তব ও কানিশকা মালহোত্রা। দুজনই ছোট সন্তানের মা। লাজপত নগরের ভিড়ের মধ্যে বেবি স্ট্রলার ঠেলে কেনাকাটা করতে গিয়ে প্রায়ই বিপাকে পড়তেন তারা। ভারী ব্যাগ, অসমান রাস্তা আর মানুষের ভিড় তাদের বুঝিয়ে দেয়— এই সমস্যায় শুধু তারা নন, প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়ছেন বয়স্ক ক্রেতারাও।
ভারতের অনেক ঐতিহ্যবাহী বাজারে এখনো আধুনিক শপিং মলের মতো সুবিধা নেই। ভাঙাচোরা রাস্তা, অতিরিক্ত ভিড় আর দুর্বল অবকাঠামোর কারণে পরিবার, বয়স্ক মানুষ ও প্রতিবন্ধী ক্রেতাদের জন্য কেনাকাটা অনেক সময় হয়ে ওঠে শারীরিকভাবে কষ্টকর।
এই বাস্তবতা থেকেই জন্ম নেয় ‘ক্যারিমেন’। পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে দুই উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধন করেন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেন এবং বাজারে চালু করেন একটি ছোট কিয়স্ক। শুরুতে পাঁচজন তরুণকে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে প্রশিক্ষণ দিয়ে যুক্ত করা হয় আরও দুজন নারী কর্মীকেও।
সহকারীদের শুধু ব্যাগ বহনের কাজই শেখানো হয়নি। তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বেবি স্ট্রলার সামলানো, বাজারে পথ দেখানো, পোর্টেবল চার্জার বা পানির বোতল সরবরাহ করা এবং সব সময় ভদ্র ও সহায়ক আচরণ করার জন্যও।
কোম্পানিটি বলছে, চালুর পর থেকেই গ্রাহকদের চাহিদা বেশ ভালো।
অল্প সময়ের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় এই সেবা। কেউ একে ভবিষ্যতের স্মার্ট শপিং সল্যুশন বলছেন, কেউ আবার দেখছেন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ হিসেবে। সমর্থকদের মতে, উচ্চ বেকারত্বের সময়ে এ ধরনের উদ্যোগ তরুণদের জন্য কাজের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, বয়স্ক নাগরিক, শিশুদের অভিভাবক ও প্রতিবন্ধী ক্রেতাদের জন্য বেশ কার্যকর হতে পারে এটি।
তবে সবাই যে প্রশংসা করছেন, তা নয়। সমালোচকদের একাংশের দাবি, এই স্টার্ট-আপ ভারতের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের মধ্যে নির্ভরশীলতার সংস্কৃতি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কর্মীদের আধুনিক যুগের ‘কুলি’ বলেও মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ। তাদের মতে, দৈনন্দিন কাজের জন্য সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভরতার মানসিকতাই ফুটে উঠছে এতে।
শ্রম অধিকারকর্মীরাও সতর্ক করছেন, দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটলে একসময় শোষণমূলক গিগ-ইকোনমি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে ‘ক্যারিমেন’।
তবে এসব অভিযোগ মানতে নারাজ প্রতিষ্ঠাতারা। তাদের দাবি, এখানে কর্মীরা গিগ-ওয়ার্কার নন, তারা পূর্ণকালীন বেতনভুক্ত কর্মচারী।
ক্যারি মেনের প্রতিষ্ঠাতা ড. ঋতু কান্দারি এই মডেলটির পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছেন, শহুরে সুবিধার একটি প্রকৃত সমস্যার সমাধান করার পাশাপাশি সুসংগঠিত কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করছে স্টার্টআপটি।
ক্যারিমেনের কর্মীরা বলছেন, এখানে তারা তুলনামূলক বেশি বেতন ও সম্মান পাচ্ছেন।
অন্যদিকে সম্প্রতি সেবাটি ব্যবহার করাদের অভিজ্ঞতাও ইতিবাচক। তাদের ভাষায়, ‘ক্যারিমেন’ কেনাকাটাকে অনেক বেশি সহজ ও আরামদায়ক করে তুলেছে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে সাতজন কর্মী কাজ করছেন। তবে ‘ক্যারিমেন’-এর পরিকল্পনা আরও বড়। এখন দিল্লির চাঁদনি চক মার্কেট এবং পরে ভারতের অন্যান্য শহরেও সেবা সম্প্রসারণ করতে চায় তারা।
কিন্তু প্রশ্ন একটাই— এই নতুন ধারণা কি সত্যিই মানুষের জীবন সহজ করবে, নাকি ধীরে ধীরে আরেকটি বিতর্কিত গিগ-ইকোনমি মডেলে পরিণত হবে? সময়ই হয়তো তার উত্তর দেবে।
সূত্র: বিবিসি, এনডিটিভি, দ্য প্রিন্ট




