দিল্লি পুলিশের হাতে আটক দুই প্রতিবাদী কণ্ঠ
আতঙ্কের নাম তিহার জেল
- কারাগারে পাঠানো হলো সিজেপির সৌরভ ও আশুতোষকে
- সিজেপি নেতাদের কারা হেফাজতে পাঠানোর খবরে সরব হয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী
- পুলিশের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে অন্যদেরও একই ধরনের কর্মসূচিতে যোগ দিতে উৎসাহিত করা হচ্ছিল
- বর্তমানে দিল্লির তিনটি কারাগার চত্বর— তিহার, রোহিণী ও মণ্ডোলী মিলিয়ে ১৬টিতে অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ১০ হাজার ২৬ জন

ভারতে আতঙ্কের আরেক নাম তিহার জেল। আর সেই তিহারেই ঠাঁই হলো ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে ফের দিল্লি পুলিশের হাতে আটক হলেন দুই প্রতিবাদী কণ্ঠ। অভিযোগ, যন্তর মন্তরে প্রবেশ ঘিরে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করেছেন তারা। এরপরই পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজত। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, একটি গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেখানে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, সেখানে প্রতিবাদীদের পরিণতি যদি হয় তিহারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ, তবে গণতন্ত্রের পরিসর ঠিক কতটা অবশিষ্ট?
বিজেপিশাসিত কেন্দ্রের অধীন দিল্লি পুলিশের ভূমিকা ঘিরে এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। বিরোধী কণ্ঠের জবাব রাজনৈতিক যুক্তিতে দেওয়ার বদলে প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রয়োগই যদি হয়ে ওঠে প্রধান অস্ত্র, তবে তা আর নিছক আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন থাকে না। তা গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের সংঘাতে রূপ নেয়। গতকাল বুধবার সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ্য করে সাংবাদিকদের বললেন, ‘ওদের কী অপরাধ? ওরা তো যন্তর মন্তরে জাতীয় পতাকা উড়িয়েছে? প্রধানমন্ত্রীজি, একটু সাহস দেখান।
সিজেপি নেতাদের কারা হেফাজতে পাঠানোর খবরে সরব হয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও। ‘এক্স’ হ্যান্ডলে তিনি লিখেছেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবে যন্তর মন্তরে জাতীয় পতাকা ওড়ানো কোনো অপরাধ নয়। সেজন্য তরুণদের জেলে পাঠানো কাপুরুষতার লক্ষণ।’ রাহুল ওই বার্তায় আরও লেখেন, ‘ছাত্র, যুবা, সাংবাদিক, ইন্ডিয়া জোট— ব্যানার ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্য এক। সবার বিক্ষোভই এক। নাগরিকরা তাদের সাংবিধানিক অধিকার চাইছেন। যন্তর মন্তর এ দেশের জনগণের। আমরা ফের তা উদ্ধার করব।’
তিহার জেলের ইতিহাস: বিচারাধীন বন্দিত্বের দীর্ঘ ছায়া
১৯৫৮ সালে তিহারে প্রথম কেন্দ্রীয় কারাগার চালু হয়। দিল্লির কারা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে সেখানে ১ হাজার ২৭৩ জন বন্দির জায়গা ছিল। পরবর্তী কয়েক দশকে বন্দির সংখ্যা ও প্রশাসনিক প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারাগার চত্বর সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে দিল্লির তিনটি কারাগার চত্বর— তিহার, রোহিণী ও মণ্ডোলী মিলিয়ে ১৬টি কারাগারে অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ১০ হাজার ২৬ জন। অথচ ২০২৬ সালের ৩০ জুনের সরকারি পরিসংখ্যানে বন্দির সংখ্যা ২০ হাজার ৯৬১। অর্থাৎ, নির্ধারিত ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি মানুষ সেখানে বন্দি। তাদের মধ্যে ১৮ হাজার ৫১৭ জন বিচারাধীন। এই পরিসংখ্যান কারাগারের বাস্তবতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলে। আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে দীর্ঘদিন বন্দি থাকতে হচ্ছে কেন?
তিহারের পরিচিতি শুধু এর বিশাল আয়তন কিংবা বন্দির সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। বহুল আলোচিত রাজনৈতিক ও ফৌজদারি মামলার সূত্রে এই কারাগার বারবার সংবাদ শিরোনামে এসেছে। দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত সাবেক টেলিযোগাযোগমন্ত্রী এ রাজা, ডিএমকে নেত্রী কানিমোঝি এবং বিভিন্ন সময়ে আলোচিত অপরাধী চার্লস শোভরাজের নাম তিহারের বন্দিজীবনের ইতিহাসে উঠে এসেছে। সংসদে হামলার মামলায় দণ্ডিত আফজল গুরুর ফাঁসিও কার্যকর হয়েছিল এই কারাগারে। তবে এই ব্যক্তিদের প্রত্যেকের মামলা, অভিযোগ ও আইনি অবস্থান আলাদা। অভিযুক্ত হওয়া আর দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক নয়। তিহারের ইতিহাস তাই একদিকে অপরাধ ও শাস্তির, অন্যদিকে বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং বন্দিদের অধিকার নিয়ে বিতর্কেরও ইতিহাস।
সেই বিতর্কের সাম্প্রতিক পরিচিত মুখগুলোর মধ্যে রয়েছেন ছাত্রনেতা উমর খালিদ ও শারজিল ইমাম। ২০২০ সালের দিল্লি হিংসার বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অভিযোগে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইনসহ একাধিক ধারায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তারা। দীর্ঘ বন্দিত্বের পরও তাদের জামিন মেলেনি। গত ৩০ সেপ্টেম্বরও দিল্লি হাইকোর্ট তাদের জামিনের আবেদন খারিজ করে দেন।
রাষ্ট্রের শক্তি কি শুধু কারাগারের প্রাচীরে?
সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার ঘটনায় সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগের বিচার আইনি প্রক্রিয়াতেই হওয়া উচিত। কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, কোনো ছাত্রনেতা সরকারের সমালোচনা করেছেন কিংবা নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ দাবি করেছেন বলেই তার প্রতিবাদকে অপরাধের সমার্থক করে দেখা যায় না। জাতীয় পতাকা হাতে প্রতিবাদ জানানো অপরাধ নয়। নির্দিষ্ট স্থানে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলে তার বিচার হতে পারে। কিন্তু সেই অভিযোগের আড়ালে প্রতিবাদের অধিকারকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়া যায় না।
গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের ক্ষমতা সীমাহীন নয়। তার বৈধতা নির্ভর করে নাগরিকের অধিকার রক্ষা, প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা এবং ভিন্নমত সহ্য করার ক্ষমতার ওপর। তিহারে পাঠিয়ে প্রতিবাদ সাময়িকভাবে স্তব্ধ করা যেতে পারে, কিন্তু তার নেপথ্যে থাকা প্রশ্নগুলোকে বন্দি করা যায় না। সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার হেফাজত তাই শুধু দুই ছাত্রনেতার কারাবাস নয়। এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের অধিকারের সম্পর্ক নিয়ে এক কঠিন প্রশ্ন।
জাতীয় পতাকা হাতে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে যদি দুই ছাত্রনেতাকে তিহারের দরজায় পৌঁছাতে হয়, তবে সেই ঘটনার বিচার শুধু পুলিশের অভিযোগের নিরিখে করলে চলবে না। দেখতে হবে, রাষ্ট্র তার ক্ষমতা প্রয়োগে সংযম দেখিয়েছে কি না, বিরোধী কণ্ঠের জন্য গণতান্ত্রিক পরিসর অক্ষুণ্ণ রেখেছে কি না। কারাগারের প্রাচীর দিয়ে প্রতিবাদকে ঘিরে ফেলা যায়, কিন্তু গণতন্ত্রের সংকটকে আড়াল করা যায় না।



