ভারতের রাজনীতির ‘নার্সারি'
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ৬০০ ক্যামেরার পাহারা
- ছাপা পোস্টার নিষিদ্ধ, মদ-মাদক মিললেই বাতিল হতে পারে প্রার্থিতা
- দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ভোট ঘিরে নজিরবিহীন কড়াকড়ি

পোস্টারে ছেয়ে যাওয়া দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস৷ ২০২৩ সালের ডিইউএসইউ নির্বাচনের দৃশ্য। এ বার ছাপা পোস্টারে নিষেধাজ্ঞা, নজরদারিতে ৬০০ ক্যামেরা। ছবি: ইরফান রহমান
আজকের ছাত্রনেতাই কাল বসতে পারেন মন্ত্রিসভায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডর থেকে তার পথ পৌঁছে যেতে পারে লোকসভা কিংবা মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে। ভারতের রাজনীতিতে এমন নজির এক-দু’টি নয়। অরুণ জেটলি, বিজয় গোয়েল, অজয় মাকেন, অলকা লাম্বা থেকে দিল্লির বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা–দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতির মঞ্চ পেরিয়েই জাতীয় বা প্রাদেশিক রাজনীতিতে বড় হয়ে উঠেছেন এমন নামের তালিকা দীর্ঘ। সেই কারণেই দিল্লি ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন বা ডিইউএসইউ-কে বহু দিন ধরেই বলা হয় ভারতের জাতীয় রাজনীতির ‘নার্সারি’, দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী ছাত্ররাজনৈতিক মঞ্চ। এ বার সেখানেই নেতা তৈরির লড়াই হবে প্রায় ৬০০ ক্যামেরার চোখের সামনে।
আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর ডিইউএসইউ নির্বাচন, ভোট গণনা ১৯ সেপ্টেম্বর৷ তার ঠিক এক মাস আগে বুধবার (১৯ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা পরিকল্পনার বিস্তারিত সামনে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মনোজ সিং এনডিটিভিকে জানিয়েছেন, উত্তর ও দক্ষিণ ক্যাম্পাস এবং সংলগ্ন এলাকা মিলিয়ে নির্বাচনী প্রচার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর নজর রাখতে প্রায় ৬০০ ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। শুধু উত্তর ক্যাম্পাসেই নতুন করে বসানো হয়েছে প্রায় ২০০ ক্যামেরা। ক্রান্তি চকের ৩ নম্বর গেট থেকে পিজিডব্লিউ রোডের দিকের এলাকাতেও রাখা হচ্ছে বিশেষ নজরদারি৷ প্রচারে হিংসা, সম্পদ নষ্ট, অর্থ ও পেশিশক্তির ব্যবহার ঠেকাতে দিল্লি পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে। নিয়ম গুরুতর ভাবে ভাঙলে কোনও প্রার্থীর মনোনয়ন তো বাতিল হবেই, প্রয়োজনে পুরো নির্বাচন বাতিল করারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়।
ডিইউএসইউর গুরুত্ব অবশ্য কেবল বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভোটে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে এই ছাত্র সংসদের সম্পর্ক প্রায় সাত দশকের। ডিইউএসইউ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৯ সালে, আর নিয়মিত নির্বাচনের ইতিহাস শুরু ১৯৫৪ সালে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশক থেকেই জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্রসংগঠন এখানে ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকে। পরে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নির্বাচন এমন এক রাজনৈতিক পরীক্ষাগারে পরিণত হয়, যেখানে ছাত্রনেতাদের বক্তৃতা, সাংগঠনিক ক্ষমতা, জনসংযোগ এবং নির্বাচনী কৌশল–সব কিছুরই প্রথম বড় পরীক্ষা হয়। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় নিজেও বলেছে, ডিইউএসইউর বহু সাবেক পদাধিকারী পরে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে গেছেন।
এই ‘নার্সারি’ যে সত্যিই নেতা বানিয়েছে, তার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ অরুণ জেটলি। ১৯৭৪-৭৫ সালে ডিইউএসইউর সভাপতি ছিলেন তিনি। জরুরি অবস্থার সময় ছাত্র আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা সেই জেটলি পরে ভারতের অর্থমন্ত্রী হন এবং বিজেপির জাতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন। ১৯৭৭ সালে ডিইউএসইউর সভাপতি নির্বাচিত বিজয় গোয়েলও পরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হন। ১৯৮৫ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে সভাপতি হওয়া অজয় মাকেন পরে দিল্লির রাজনীতি পেরিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নেন। ১৯৯৫ সালে ডিইউএসইউর সভাপতি ছিলেন অলকা লাম্বা৷ পরে তিনি দিল্লির বিধায়ক এবং কংগ্রেসের পরিচিত রাজনৈতিক মুখ হয়ে ওঠেন।
আরও সাম্প্রতিক এবং সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ রেখা গুপ্তা৷ ১৯৯৬-৯৭ সালে ডিইউএসইউর সভাপতি ছিলেন তিনি। ছাত্র সংসদ থেকে শুরু হওয়া তাঁর রাজনৈতিক পথ পৌর রাজনীতি হয়ে পৌঁছেছে দিল্লির সর্বোচ্চ নির্বাচিত নির্বাহী পদে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী। অর্থাৎ যে ছাত্র সংসদের সভাপতি হিসেবে এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে প্রচার করেছেন, কয়েক দশক পরে সেই দিল্লিরই সরকারপ্রধান হয়েছেন তিনি।
এই ইতিহাসই ডিইউএসইউ নির্বাচনকে ভারতের অন্য সাধারণ ক্যাম্পাস ভোট থেকে আলাদা করে। এখানে মূল লড়াই দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতির দুই প্রধান ধারার ছাত্রসংগঠন আরএসএস-ঘনিষ্ঠ অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) এবং কংগ্রেসের ছাত্রসংগঠন ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া (এনএসইউআই)-কে ঘিরে। ফলে ক্যাম্পাসের জয়-পরাজয়কেও প্রায়ই জাতীয় রাজনীতির শক্তির ছোট প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা হয়। এনডিটিভি ডিইউএসইউ-কে ভারতের ছাত্ররাজনীতির সবচেয়ে বড় মঞ্চ এবং জাতীয় রাজনীতির ‘নার্সারি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে; টাইমস অব ইন্ডিয়ার ভাষায়, এটি দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরির এক গুরুত্বপূর্ণ উৎসমঞ্চ।
কিন্তু সেই ক্ষমতার লড়াইকে এ বার লাগাম পরাতে চাইছে বিশ্ববিদ্যালয়। ছাপা পোস্টার, প্রচারপত্র বা লিফলেট ব্যবহার করা যাবে না। প্রতিটি কলেজে নির্দিষ্ট দুটি ‘গণতন্ত্রের দেয়াল’ রাখা হবে, সেখানে কেবল হাতে তৈরি পোস্টার লাগাতে পারবেন প্রার্থীরা। ছাপা প্রচারসামগ্রী বিলি বা সরকারি-বেসরকারি সম্পদ নষ্ট করলে আইনি ব্যবস্থার মুখেও পড়তে হতে পারে। একসঙ্গে পাঁচ জনের বেশি শিক্ষার্থী প্রচারে থাকতে পারবেন না। মহিলা কলেজে প্রচারে ঢুকতে পারবেন কেবল মহিলা শিক্ষার্থীরাই।
নজরদারি থাকবে গাড়ির উপরেও। কালো কাচ কিংবা বেআইনিভাবে পরিবর্তিত গাড়িতে চলাচল করলে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। ইতিমধ্যেই নিয়ম ভাঙার অভিযোগে শিক্ষার্থীদের ৪০ থেকে ৫০টি জরিমানার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নম্বরপ্লেটবিহীন একটি বিলাসবহুল গাড়িও আটক করেছে পুলিশ; নির্বাচনের সময় সেটির অপব্যবহার ঠেকাতে ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত গাড়িটি পুলিশি হেফাজতে রাখার কথা জানানো হয়েছে।
আরও কঠোর ব্যবস্থা রয়েছে মদ, মাদক কিংবা ভোটারকে প্রলোভন দেখানোর ক্ষেত্রে। কোনও প্রার্থীর গাড়ি থেকে মদ বা মাদক পাওয়া গেলে তাঁর মনোনয়ন তাৎক্ষণিক বাতিল হতে পারে। গত কয়েক বছরে শিক্ষার্থীদের বাসে করে ওয়াটার পার্ক বা বিনোদনকেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে পার্টি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এ ধরনের আয়োজন কোনও প্রার্থীর প্রচারের সঙ্গে যুক্ত বলে প্রমাণিত হলেও একই শাস্তি হতে পারে।
নজরদারি ক্যাম্পাসের গণ্ডিতেও আটকে থাকছে না। দিল্লি পুলিশের সাইবার অপরাধ দপ্তর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার পর্যবেক্ষণ করবে। সংবেদনশীল এলাকায় সাদা পোশাকের পুলিশ এবং মহিলা পুলিশও থাকবে। বিজয় নগর, বেগম সরাই ও জিয়া সরাইয়ের মতো যেসব এলাকায় বহু ছাত্রী ভাড়া বা পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকেন, সেখানেও বিশেষ নজরদারি চালানো হবে, যাতে নির্বাচনী প্রচারের নামে তাঁদের ভয় দেখানো বা হয়রানি করা না যায়।
কেন এত কড়াকড়ি
এত কড়াকড়ির পেছনে রয়েছে ২০২৪ সালের তিক্ত অভিজ্ঞতা। সে বার পোস্টার, ব্যানার, দেয়াললিখন ও রঙে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের পাশাপাশি বাস, বাসস্টপ এবং মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত নষ্ট করার অভিযোগ উঠেছিল। বিষয়টি দিল্লি হাইকোর্টে পৌঁছলে আদালত ভোটগ্রহণের অনুমতি দিলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, নষ্ট সম্পত্তি পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত ভোট গণনা করা যাবে না। শেষ পর্যন্ত পরিচ্ছন্নতার কাজ শেষ হওয়ার পর নভেম্বরে গণনার অনুমতি মেলে। আদালত অর্থ ও পেশিশক্তির ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
তাই এ বারের বার্তাটি স্পষ্ট। ভারতের রাজনীতির যে ‘নার্সারি’ থেকে অতীতে মন্ত্রী, সাংসদ থেকে মুখ্যমন্ত্রী বেরিয়েছেন, সেখানে ভবিষ্যতের নেতাদের লড়াই চলবে কিন্তু আগের মতো লাগামহীন ভাবে নয়। নেতা হওয়ার প্রথম পরীক্ষা এ বার শুধু ব্যালট বাক্সে নয়, ৬০০ ক্যামেরার চোখেও।







