মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সতর্কবার্তা
ন্যাটোভুক্ত দেশে হামলা চালাতে পারে রাশিয়া
- সামরিক অভিযান চালালে তা সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সমরাস্ত্রের ঘাটতি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের

সম্ভাব্য হামলার ধরন হতে পারে সাইবার আক্রমণ থেকে শুরু করে সীমিত পরিসরে সামরিক অভিযান পর্যন্ত।
ন্যাটোভুক্ত যেকোনো দেশে হামলা চালাতে পারে রাশিয়া। আসন্ন শরৎকাল (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর) থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে যেকোনো সময় এ হামলা হতে পারে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটটির ঐক্য ও প্রতিক্রিয়া যাচাই করতেই মস্কো এ ধরনের হামলা চালাতে পারে বলে সতর্ক করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। নতুন গোয়েন্দা মূল্যায়নের বরাতে গতকাল শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য হামলার ধরন হতে পারে সাইবার আক্রমণ থেকে শুরু করে সীমিত পরিসরে সামরিক অভিযান পর্যন্ত। এ ধরনের অভিযানের মাধ্যমে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ন্যাটোর ঐক্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মধ্যে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করতে পারেন বলে ধারণা করছে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, চীন বা রাশিয়া কোনো সামরিক অভিযান চালালে, তা সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সমরাস্ত্রের ঘাটতি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল, আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম (এটিএসিএমএস) এবং স্বল্পপাল্লার স্টিংগার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদে বর্তমানে আশঙ্কাজনক স্বল্পতা রয়েছে।
আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো হিদার কনলি বলেছেন, এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে, ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। তার মতে, ন্যাটোর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং যুক্তরাষ্ট্রকে তার মিত্রদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়ার অন্যতম লক্ষ্য।
এ বছর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা ছিল, ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ বাহিনী ব্যস্ত থাকায় মস্কো ন্যাটোকে উসকে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেবে না। তবে বর্তমান পরিস্থিতির বিচারে মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন, ন্যাটোর দৃঢ়তা পরীক্ষা করার মতো ঝুঁকি নেওয়ার চেষ্টা চালাতে পারেন পুতিন।
ইউক্রেন যুদ্ধে দ্রুত সাফল্য অর্জনের জন্য দেশে ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে রয়েছেন পুতিন। একই সময়ে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাশিয়ার তেলশিল্প এবং যুদ্ধক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে বাধার মুখে পড়ছে রুশ বাহিনী। এর আগেও ন্যাটো দেশগুলোর নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটিয়েছে রাশিয়া। কখনো রুশ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে পোল্যান্ডে, আবার কখনো রোমানিয়ার আকাশসীমায় প্রবেশ করেছে রুশ ড্রোন। এসব ঘটনাকে ন্যাটো ঠিক কতটা আঘাতে চুপ থাকে, তা পরীক্ষা করার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
ন্যাটোর মুখপাত্র কর্নেল মার্টিন ও’ডোনেল বলেছেন, ‘আমরা সবসময় বিভিন্ন ধরনের সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করি এবং সেগুলোর জন্য প্রস্তুতি নিই। ন্যাটো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি, যার প্রমাণ আমরা অব্যাহতভাবেই দিচ্ছি।’ নতুন গোয়েন্দা মূল্যায়নগুলো মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে আগে থেকেই বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুদ ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কিছু দূরপাল্লা ও স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুদও কমে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্যাট্রিয়ট, এসএম-৩ এবং টার্মিনাল হাই-অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ইন্টারসেপ্টর, পাশাপাশি থাড রাডার এবং আকাশ প্রতিরক্ষা আর্টিলারি ইউনিট।
তবে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল অস্ত্রের মজুদ ঘাটতির দাবিকে মিথ্যা বলে অভিহিত করেছেন। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র আনা কেলি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘সব কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের জন্য’ মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে ‘পর্যাপ্তের চেয়েও বেশি’ অস্ত্র রয়েছে। তবে তিনি একই সঙ্গে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের আরও বেশি অস্ত্র উৎপাদনের আহ্বান জানিয়েছেন। পারনেল বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট যখন যেখানে আঘাত হানার নির্দেশ দেবেন, সেখানে এবং সেই সময়ে আঘাত হানার জন্য যা কিছু প্রয়োজন, সবই আমাদের কাছে রয়েছে। একাধিক কমব্যাট্যান্ট কমান্ড জুড়ে আমরা এরই মধ্যে সফল অভিযান পরিচালনা করেছি, একই সঙ্গে আমাদের জনগণ ও স্বার্থ রক্ষার জন্য গভীর এবং প্রস্তুত অস্ত্রভাণ্ডারও বজায় রেখেছি। কোনো প্রতিপক্ষ যদি সংবাদমাধ্যমের শোরগোলকে আমেরিকার দুর্বলতা বলে ভুল করে, তাহলে তাকে কঠিন পথেই সত্যটি জানতে হবে।’
রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতে প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল এবং আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেমস, যেগুলো দুটিই হাই-মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম (হিমার্স) থেকে নিক্ষেপ করা যায় এবং স্টিঙ্গার ক্ষেপণাস্ত্র রুশ স্থল আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) টম কারাকো।
গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুদের এই ঘাটতি মার্কিন সরকারের ভেতরে অস্ত্রভাণ্ডার কমে যাওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে। একই সময়ে ইরান নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, ট্রাম্প তা বিবেচনা করছেন।
মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সম্প্রতি হোয়াইট হাউজকে সতর্ক করেছেন যে, আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের সংখ্যা কমে গেছে। এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। কেইনের জন্য এটি উদ্বেগের বিষয় হলেও তিনি মনে করেন, অস্ত্রের কম মজুদ ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। তবে এর ফলে ঝুঁকি বেড়ে যাবে।
সরকারের বাইরের বিশ্লেষকরাও বারবার সতর্ক করে আসছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার বিশ্ব জুড়ে প্রতিপক্ষদের প্রতিহত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে। এর মধ্যে শুধু রাশিয়া নয়, চীনও রয়েছে।




