অখুশি ট্রাম্প, স্টারমার এখন কী করবেন?

ইরান সংকটে যুক্তরাজ্যের অবস্থান নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক করতে সামরিকভাবে সক্রিয় হতে ব্রিটেনের অনাগ্রহে হতাশা জানিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ট্রাম্প।
গত সোমবার ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প জানান যুক্তরাজ্যের অবস্থান নিয়ে তিনি খুশি নন। এই সংকট মোকাবিলায় লন্ডনের উৎসাহের সঙ্গে অংশ নেওয়া উচিত ছিল। তিনি যুক্তরাজ্যকে অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে উল্লেখ করেন।
ক্ষুব্ধ ট্রাম্প
‘কিছু দেশ আমাকে ভীষণভাবে হতাশ করেছে। ওরা হয়তো অংশ নেবে, কিন্তু তা হওয়া উচিত পুরো উদ্যম নিয়ে’, বলছিলেন ট্রাম্প।
এর আগে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার স্পষ্ট করে বলেছিলেন, যুক্তরাজ্য কোনোভাবেই বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চায় না। তিনি জানান, হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে মিত্রদের সঙ্গে সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে লন্ডন। তবে এটি সহজ কাজ নয়।
এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছে ইরান। একইসঙ্গে সমুদ্রপথে মাইন পেতে রাখার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে ইতিমধ্যে বেড়ে গেছে তেলের দাম।
ট্রাম্প জানান, তিনি সরাসরি স্টারমারের কাছে ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ ও মাইন অপসারণকারী নৌযান পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
‘আমি বলেছি, কয়েকটি জাহাজ পাঠালে খুবই সহায়ক হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বললেন, তিনি তার দলের সঙ্গে আলোচনা করবেন। আমি বলেছি, আপনি তো প্রধানমন্ত্রী, সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আলাদাভাবে দলের সাথে কথা বলার দরকার কী? এটা হতাশাজনক’, মন্তব্য করেন ট্রাম্প।
অনেক ক্ষেত্রে মিত্রদের কাছে সহায়তা চাওয়া হয় তাদের প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্যই। ‘আমাদের প্রয়োজন আছে বলেই নয়, বরং তারা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, তা দেখতে চাই’, ব্যাখ্যা করেন ট্রাম্প।
ইরানবিরোধী প্রাথমিক হামলায় ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। যদিও পরবর্তীতে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবহারের জন্য সেই অনুমতি দেয় যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, তারা এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে মিত্রদের সঙ্গে সমন্বিত কৌশল খুঁজছে। ‘ব্রিটেনের স্বার্থ বিবেচনায় যা সঠিক মনে হবে, সেটিই করব’, জানান তিনি।
যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে নিজেদের আওতাধীন অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে। রয়্যাল নেভির রণতরী এইচএমএস ড্রাগন ১০ মার্চ পোর্টসমাউথ থেকে রওনা দিয়ে সাইপ্রাসের আরএএফ আক্রোতিরি ঘাঁটি সুরক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে, যা সম্প্রতি ইরানি ড্রোন হামলার শিকার হয়। তবে স্থায়ীভাবে মোতায়েন থাকা মাইন অপসারণকারী জাহাজ এইচএমএস মিডলটন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দেশে ফিরে গেছে। বর্তমানে সমুদ্রে পাতা মাইন শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করতে উন্নত ড্রোন প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করার পরিকল্পনা করছে লন্ডন।
ইউরোপীয় ফ্রিগেট দিয়ে কী হবে
ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালী খুলতে ন্যাটো সদস্যরা এগিয়ে না এলে জোটটির ভবিষ্যৎ খুব খারাপ হতে পারে। তবে ইউরোপের নেতারা এই অবস্থানের বিরোধিতা করেছেন।
জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস স্পষ্ট করে বলেন, বার্লিন কোনো সামরিক অংশগ্রহণে যাবে না। তার প্রশ্ন, বিশাল মার্কিন নৌবাহিনী যেখানে আছে, সেখানে কয়েকটি ইউরোপীয় ফ্রিগেট দিয়ে কী হবে?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান ক্যাজে কালাস জানান, এই ইস্যুতে সামরিক ভূমিকা বাড়ানোর কোনো আগ্রহ নেই। সাবেক ব্রিটিশ সামরিক প্রধান নিক কার্টারও মন্তব্য করেন, ন্যাটো মূলত প্রতিরক্ষামূলক জোট, আক্রমণাত্মক যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য এটি তৈরি হয়নি।
ব্রিটেনের অভ্যন্তরেও বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধী কনজারভেটিভ দলের নেতা কেমি ব্যাডেনচ অভিযোগ করেন, স্টারমার মিত্রদের সঙ্গে যথেষ্ট সক্রিয়ভাবে যুক্ত নন। অন্যদিকে লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা সামরিক পদক্ষেপের বদলে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
জটিল পরিস্থিতিতে স্টারমার
লেবার পার্টির এমপি এমিলি থর্নবেরি যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সম্ভাব্য রাষ্ট্রীয় সফর স্থগিতের পরামর্শ দিয়েছেন। একই দলের আরেক এমপি অ্যান্ডি ম্যাকডোনাল্ড সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালীতে নজরদারির দায়িত্ব নেওয়া মিশন ক্রিপ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যা ব্রিটেনকে বড় সংঘাতে টেনে নিতে পারে।
স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়েও সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। তার অভিযোগ, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে উপদেষ্টাদের ওপর বেশি নির্ভরশীল।
এমন সমালোচনার মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘গেট ইন— দ্য ইনসাইড স্টোরি অব লেবার আন্ডার স্টারমার’ বইটি, যার লেখক প্যাট্রিক ম্যাগুয়ের ও গ্যাব্রিয়েল পোগ্রান্ড৷ বইটির হালনাগাদ সংস্করণে লেবার দলের ভেতরের কিছু সূত্রের বরাতে স্টারমারকে নিষ্ক্রিয় ও অতিরিক্তভাবে ব্রিফিংনির্ভর হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এ বইয়ের অংশবিশেষে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্তে স্টারমার অনুপস্থিত ছিলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে নথি পড়ে প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর নির্ভর করতেন। কিছু সহযোগী তার সিদ্ধান্তগ্রহণের সক্ষমতা ও বৌদ্ধিক আগ্রহ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
ওয়াশিংটনের চাপ ও দেশের অভ্যন্তরীণ সমালোচনার মধ্যে স্টারমার এখন একটি জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি। একদিকে মিত্রদের প্রত্যাশা, অন্যদিকে সংঘাত এড়িয়ে চলার নীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাই তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

